মুছাদুল ইসলাম 
সাময়িকী.কম

মা-হারা অপলার সংসারে আরো দুটি প্রাণের অস্তিত্ব আছে। অপলার বাবা আর বুড়ি। বুড়ি কোনো মানুষের নাম নয়। বুড়ি হল কন্যা স্নেহে লালিত একটি গরুর নাম। বাবা অনেক যত্ন করে নাম দিয়েছিল বুড়ি।
অপলার বাবা খাজনা নেওয়া জমি চাষ করে ফসল ফলায়। তাতেই বাবা-মেয়ের সংসার কোনো রকমে চলে যায়। গতবছর অপলা তার টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে যে অর্থ জমিয়েছিল তা দিয়ে বৈশাখী মেলা হতে রেশমি চূড়ি‚লাল আর সবুজ রঙের ফিতা‚আলতা আর একটি মেয়ে পুতুল কিনেছিল। টাকার অভাবে সেবার ছেলে পুতুল কেনা হয়নি বলে পুতুলের বিয়ে আর দেওয়া হল না। কিন্তু এবার পুতুলের বিয়েটা যে দেওয়াই চায়। তা না হলে বয়স অবৈধ ভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে ছেলে পক্ষ যে মেয়ে পক্ষকে গ্রহণ করতে চাইবে না। তাই পুতুল বিয়ে নিয়ে অপলার চিন্তার শেষ নেই।
পুতুল বিয়ের আর দুদিন বাকি। এবারের পহেলা বৈশাখেই ধুমধাম করে পুতুলের বিয়ে হবে। বিয়েতে তাই প্রয়োজন নতুন গহনা‚শাড়ি সহ আরো কত কিছু। বৈশাখের আগের দিন অপলা বাবার কাছে বায়না ধরে বসলো পুতুল আর শাড়ি-গহনা কিনে দেওয়ার জন্য। বাবা অপলাকে ধমক দিয়ে বলল‚"দুবেলা খাওন জোটে না‚আবার পুতুল বিয়ে‚শখ কত!" অপলা কিছুক্ষণ ডুকরে ডুকরে কেঁদে রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। বাবা আগে কখনো শত দুখের মাঝেও অপলাকে এমন করে শক্ত কথা বলেনি। মা-মরা মেয়েটিকে এভাবে ধমক দিয়ে বাবাও কিছুক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদল। অভাব যেখানে বাসা বাঁধে সেখানে ঈশ্বরের কৃপা তো দূরে থাক‚পিতৃস্নেহও যেন চৈত্রের দুপুরের মত রুক্ষ হয়ে যায়। এদিকে সকাল হলেই পহেলা বৈশাখ। জমির খাজনা শোধ দিতে হবে। ঘরে একটি কানা কড়িও নেই। থাকবে কোথা থেকে? বন্যায় ফসল ধুয়ে সে যে এমনিতেই দেনার দায়ে ডুবে আছে। অনাহারে বাবা-মেয়ের রাত অতিবাহিত হল।
বৈশাখের প্রথম সকাল। অপলা ভোরবেলা উঠে প্রতিদিনের মত গোয়াল ঘরে গেল। গোয়াল ঘরে বুড়িকে দেখতে না পেয়ে অপলা নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। গোয়াল ঘরের খা খা শূন্যের মত অপলার হৃদয়ও হু হু করে উঠলো। বাবাও অপলাকে না বলে সকাল বেলা কোথায় যেন বেরিয়েছে।
তখন ভরদুপুর। অপলা দেখল‚তার বাবা হাতে পুতুল‚রঙ্গিন ফিতা‚রেশমি চূড়ি ও হলদে রঙ্গের শাড়ি নিয়ে বাড়িতে ফিরছে। প্রথমে অপলা খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। পরক্ষণেই অপলার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। অপলা এতক্ষণে বুঝে গেল যে‚বুড়ি এখন নিশ্চয় এখন কোনো কষাইয়ের হাতে বলি হচ্ছে। অপলা আর এক বিন্দু জলও চোখে ধরে রাখতে পারল না। টপটপ করে তার চোখের জল নিচে গড়িয়ে পড়ল। অপলা তার বাবাকে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল‚"বাবা তুমি বুড়িকে কষাইয়ের হাতে দিয়ে এলে।" অপলা আর একটিও কথা বলতে পারল না। এরপর বাবা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে রুদ্ধস্বরে কান্না শুরু করে দিল। সে কান্নার শব্দ হয়তো বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়নি তবে ধনকুবেরের বুকে বিঁধেছিল কি না জানি না।
এরপর শেষ বিকেলে অপলা তার পুতুলের বিয়ে দিল। কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত হারানো কে স্বীকার করে কিছু পাওয়ার মধ্যে সম্পন্ন হল পুতুলের বিয়ে। 

মুছাদুল ইসলাম
খুলনা
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.