“কেমন আছিছ বাবা? কত দিন হয় বাড়িতে আসিস না...!” চিঠির কথাগুলো পুনঃপুন পড়তে লাগল সৈকত। এমন দরদমাখা চিঠি কালেভদ্রেই মিলে। চিঠিতে হয়ত পেট ভরে না ঠিকই কিন্তু কোন কোন চিঠির ভাষা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বাড়ির কথা খুব মনে পড়তে লাগল তার। কিন্তু কী আর করা এ মাসেও যে ছুটি হবে না! সেনাবাহিনীর চাকরি বলে কথা; তাও আবার নতুন চাকরি! বাবা শামসুল ভূইয়ার চিঠির উত্তরে লেখলো - আরও মাসখানেক দেরি হবে, দুশ্চিন্তা করো না।

অগ্রহায়ণ মাসের শেষ। ঝলমলে রোদ। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা পৃথিবীকে যেন আরো সুশ্রী করে তোলার নিরন্তর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গ্রামে এ সময় নতুন ধানের পিঠা-পায়েসের ধুম চলে। কত জাতের পিঠা! পিঠার কোন কোন আইটেম অবলীলায় কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু যে হারিয়ে যাচ্ছে তা নয়, নতুন নতুন আইটেমেরও অবশ্য জন্ম হচ্ছে। পুরাতন স্থলে নতুন জন্ম নেবে এটাই তো স্বাভাবিক। কেননা প্রকৃতি শূন্যস্থানে বিশ্বাস করে না। প্রতীক্ষার পালা যেন আর শেষ হয় না।

দিন গড়িয়ে রাত। হঠাৎ সৈকতের চিঠি আসে। অন্ধলোক হঠাৎ চোখে দেখতে পেলে যে রকম আনন্দের অনুভূতি হয় তেমনি অবস্থা শামসুল ভূইয়ারও। এই বুঝি ছেলে রওয়ানা দিল! কত দিন হয় ছেলেকে দেখে না! মাত্র কয়েক মাস, কিন্তু তার কাছে এই কয়েকটি মাসই মনে হল কয়েক’শ শতাব্দি। ব্যাকুলতা উপচে পড়ে ভরা নদীর জোয়ারের মত। শতাব্দির নিংড়ানো আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চিঠি খোলে। কিন্তু একি! মুহূর্তেই তার চোখ মুখ বিষণ্নতায় ছেয়ে যায়। প্রলাপের স্বরে বলে - নাহ! এবারো ছুটি পেলি না?

পরিবারের একমাত্র সন্তান সে। বাবা মায়ের সব স্বপ্ন, স্নেহ-ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দু যে একমাত্র সেই। মা নীলা বেগম শামসুলের কাছ থেকে চিঠিটি নিয়ে বার বার হাত বুলায়; যেন সে তার ছেলেকেই স্নেহ করছে! নীলা বেগমের চোখ অশ্রুতে সিক্ত হয়ে ওঠে। আচল দিয়ে আড়াল করে চোখ মুছার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। এক সময় ঢুকরে কেঁদে ওঠে। সৈকতের বাবা শামসুল তাকে সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু সে সান্ত্বনাতেই কি আর মায়ের মন ভরে! কাঁদো কাঁদো স্বরে শুধায় - ওগো! ছেলের মত তুমিও এত পাষাণ হলে? ওর না হয় ছুটি নাই, তাই বলে আমরাও কি তাকে দেখতে যেতে পারি না?

শামসুল ভূইয়া নীলা বেগমের মাথায় হাত দিয়ে বলে- অধৈর্য হয়ো না। মাত্র তো কটা দিন! দেখো, দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।

- আমি বলি কি - তুমি একবার না হয় ওকে দেখে আসো, আমি কিছু পিঠা করে দেই। কত দিন হয় ছেলেটা আমার হাতের পিঠা খায় না! বলতে বলতে আবারও কণ্ঠধরে আসে নীলা বেগমের। চোখ ছলছল করে ওঠে। শামসুল ভূইয়া তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে এইবার আর না করতে পারলো না। নীলা বেগমের মাথায় স্নেহসিক্ত হাত বুলিয়ে আশ্বাসের মাত্রাটা তীব্র করে বলল- বেশ, পিঠা বানাও, আমি কালই রওয়ানা দেব।


পরদিন সকাল সকালই রওয়ানা দেয় শামসুল ভূইয়া। কিন্তু দুরত্ব বেশি হওয়ায় সেনানিবাসে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় মধ্যরাত হয়ে যায়। মধ্যরাতে সেনানিবাসের অভ্যন্তরে ঢুকতে হলে অনেক প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়। শামসুল ভূইয়া কানে একটু কম শোনে। তার অবশ্য কারণও আছে। সে অনেক দিন আগের কথা। পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে দেশে তখন মুক্তিবাহিনির প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। শামসুল ভূইয়া সেদিন সিলেটের আখাউড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংকারে পাহারার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ছিলেন অকোতোভয় যোদ্ধা। প্রতিটি অপারেশনেই কমাণ্ডার তার সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। সেদিন রাত্রে সে একাই ব্যাংকার ডিউটি দিচ্ছিলেন। ডিউটিচ্ছলে এদিক সেদিক পায়চারি করছিলেন। মধ্যরাত্রে হঠাৎ তার একটু পাশেই পাকিস্তানীদের ভারি একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। ভাগ্যগুণে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও বোমা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি প্রায় অর্ধেক নষ্ট হয়ে যায়। এরপর থেকেই তিনি কানে কম শুনতেন।

যুদ্ধের পর অনেক চিকিৎসা-পাতি করার পরও শ্রবণশক্তির তেমন বিশেষ কোন উন্নতি হয়েছে বলে মনে হল না। অবশ্য তার এই শ্রবণশক্তিজনিত ত্রুটি নিয়ে তাকে প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যায় ভোগতে হয়েছে এবং এখনো ভোগতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বড় ধরনের মাশুলও দিতে হয়। যাই হোক, কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ছেলের বাসার দিকে হনহন করে চলতে লাগল সে। পেছন থেকে এক সৈনিকের উৎকণ্ঠিত কয়েকটি শব্দ ভেসে এল - থামুন!

- থামুন প্লিজ!

শামসুল ভূইয়া নিরুত্তর।

নেপথ্যে সৈনিকের আরও কর্কশ ধ্বনি ভেসে এল- থামুন! থামুন!! থামুন!!! গুলি করব কিন্তু!

আকাশে তখন একফালি চাঁদ দূর দিগন্তে ম্লান হওয়ার অপেক্ষায়। শনশন বাতাস বইছে। কোথাও পাখ-পাখালির একটু কিচির-মিচির পর্যন্ত নাই। মানব প্রজাতির মত তারাও মনে হয় পরিবার পরিজন নিয়ে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন! শামসুল ভূইয়া হনহন করে চলতে থাকে দক্ষিণের দিকে। অস্ত্রগারের পাশ দিয়ে যেতে হয়। দিনের বেলায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল কিনা তা শামসুল ভূইয়া খেয়াল করেন নি। কিন্তু রাত দশটার পর থেকেই যেন দমকা বাতাস চারদিকের গাছপালার সাথে অসম্ভব ধ্বস্তা-ধ্বস্তিতে মেতে ওঠছে। দক্ষিণা বাতাসের প্রাবল্যে সে কর্তব্যরত সৈনিকের কর্কশ হাঁক-ডাক আরও পিছন দিকে নিয়ে গেল, তার কান পর্যন্ত পৌঁছল না। আকাশের বুক জুড়ে কালো মেঘের চড়াৎ চড়াৎ ধ্বনি ক্রমশই ভয়ের সৃষ্টি করে চলছে। অবস্থা দেখে মনে হয় যেন এখনই বৃষ্টি নামবে কিন্তু নামছে না।

খানিক পরই আবার হঠাৎ করে বাতাসের দমকা হাওয়া থেমে যায়। স্তব্দ হয়ে যায় চারপাশ। প্রকৃতিকে বুঝে ওঠা মাঝে মাঝেই মুশকিল হয়ে পড়ে। সৈনিক ভাবে হয়ত ডাকাত হবে। তাছাড়া যেহেতু বারবার ডাকার পরও সে থামছে না সেহেতু এক সময় তার ধৈর্যের চ্যুতি ঘটল। আইনের সঠিক প্রয়োগ করল। একটি গুলির শব্দ। চারদিকে যেন শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়ে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল দূর থেকে দূরান্তরে। এরপর মনুষ্য শব্দহীন খাঁ খাঁ নীরবতায় রাত কেটে যায়।


সকাল বেলা। একেবারেই মেঘমুক্ত শান্ত-স্নিগ্ধ আকাশ। আকাশের বুকে আজ কোন প্রকার দুঃখের কালিমা নেই। জগদ্দল পাথরের মত আকাশের বুকে চেপে থাকা কালোমেঘ রূপী দুঃখ নেই। মিষ্টি আলোর আভায় ক্রমশই যেন পৃথিবী ভরে ওঠছে। উত্তরীয় ফুরফুরে বাতাসে সেনানিবাসের সুসজ্জিত বৃক্ষগুলো সজীবতায় যেন পুনঃপুন হেসে ওঠছে। সেই কর্তব্যরত সৈনিক হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা শেষ করে গুলি করা সেই ব্যক্তিকে দেখতে যাবে এমন সময় উর্ধ্বতন অফিসার কর্তৃক তলব আসে। মনে মনে ভাবে অস্ত্রগার রক্ষার মহান দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। এবার প্রমোশন আর ঠেকায় কে!

ঊর্ধ্বতন কর্মকতার নিকট অস্ত্রগার রক্ষার্থে সে আইনের সঠিক প্রয়োগের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখায়। অনেক জেরার পর তাকে আপাদত ছেড়ে দেওয়া হয়। কর্মকর্তার কক্ষ থেকে সে বের হয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিজের পক্ষে আরও বেশ কিছু জোড়ালো যুক্তির কথা চিন্তা করতে করতে নিজের কক্ষে ফিরে আসলো। গল্পের বই পড়ার চেষ্টা করছে। নাহ্ ! আজ কোনভাবেই যেন সে গল্পে মনোনিবেশ করতে পারছে না। তার ভেতরে কেমন যেন হাই-হুতাশ করছে। কিসের যেন শূন্যতা তার ভেতরটাকে ওলটপালট করে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করছে। আজ তার এমন লাগছে কেন? নিজের প্রশ্নের কোন উত্তর নিজের কাছে খুঁজে না পেয়ে বিছানাতে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। তার ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠছে। মানব মন বড়ই বিচিত্র!

অপরাহ্ণ। সকালের মত এখন সূর্যের সেই অমিত প্রভা নেই। নেই সেই স্নিগ্ধতা, সেই উজ্জ্বলতা। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কোথায় যে তা ম্লান হয়ে গেল! মানব মন আর আকাশের প্রকৃতি–উভয়েকে বুঝে উঠাই বেশ কষ্টসাধ্য। ক্ষণেই একরকম আবার ক্ষণেই আরেক রকম! যাইহোক, এরই মধ্যে অনেক দর্শনার্থী কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে–“এই লোক ডাকাত হতে পারে না! ডাকাতের কোন সরঞ্জামাদিই নেই তার কাছে। কেবল পাওয়া গেছে রক্তে রঞ্জিত কিছু পিঠা আর একটি চিঠি”। যে লোকটাকে নিয়ে এত রহস্যের ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে তাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হল সৈনিকের। ভিড় ঠেলে ধীর পায়ে কাছে যায়।

সূর্য তখন এক টুকরো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। রাতের সেই দমকা বাতাসের লেশও নেই। কিন্তু তথাপিও সেনানিবাসের নীরব এলাকা ক্রমেই সরব হয়ে ওঠছে। পরিচিত অপরিচিত অনেকেই এখানে আছে, আরো অনেকেই আসতেছে। সৈকতের বন্ধু নিলয়ও তার পিছু অনুসরণ করলো। পূর্ব পরিচয় ছিল না। চাকরি সূত্রেই পরিচয়। তাছাড়া সেনানিবাসের ব্যারাকে তারা পাশাপাশি বেডে থাকে। চলাফেরা করতে করতে অনেকটাই সে সৈকতের অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে ওঠেছে। বাবা-মার স্নেহ-ভালবাসার কথা, চিঠির কথা প্রায়ই সে রূপকথার গল্পের মত করে নিলয়ের কাছে বলত। আর নিলয়ও তা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনত। সৈকতকে উৎসাহ দেয়ার জন্য শিশুদের ন্যায় কৌতূহল উদ্দীপক প্রশ্নের আদলে বলত - তারপর... তারপর?
পৃথিবীতে সন্তানেরা বাবা-মার জন্য এত ব্যাকুল থাকে! এত হৃদয়ের টান! সত্যিই নিলয়ের মন সে পরিবর্তন করে দিয়েছে। নানামুখি গুঞ্জন শুনে বন্ধুর সহযোগিতার জন্য নিলয়ও এসেছে। সৈকত সামনে যেতেই অনেকই চাপা স্বরে বলতে লাগলো- আহা! এমন গ্রাম্য সহজ সরল লোকটাকে কোন পাষণ্ড সৈনিকেই না মারল! অনেক কিছু শুনেও সে শুনছে না। লাশের কাছে গিয়েই সে বজ্রাহত হল। বাবা বলে তীব্র চিৎকার করে উঠল সেই সৈনিক। তার সে চিৎকারের শব্দ বোমা বিস্ফোরনের শব্দের মতই চারদিকে প্রতিধ্বনিত হল। দর্শনার্থীরাও তখন নীরব। আকষ্মিক এ নাটকীয়তায় মুহূর্তেই সেখানে গভীর নীরবতা নেমে এল। বাবা! কথা বলো। কথা বলো বাবা! বাবা, কথা বলো। আমি তোমার সৈকত! . . . আমি সেই পাষণ্ড!
শামসুল ভূইয়া রক্তাক্ত লাশ নিজের বুকে চেপে ধরে বলে – বাবা! আমি নিজের হাতে তোমাকে… বাবা! তার আর্তচিৎকারে হাহাকার করে উঠে সেনানিবাস প্রাঙ্গন। কোথাও যেন তখন পিন পতনের শব্দটিও নেই। উপস্থিত দর্শনার্থীরাও অনেকেই তখন কেউ না দেখার ছল করে চোখের পানি মুছার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। আকাশে একটুকরো কালোমেঘ মুহূর্তেই যেন সমস্ত আকাশ ছেয়ে যাবার উপক্রম করছে।
এরপর সৈকত আর কথা বলতে পারে নি। সে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। ততক্ষণে সমস্ত সেনানিবাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সংবাদটি। দূর দূরান্ত থেকে সাংবাদিক এবং সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আসল এমন মর্মাহত সংবাদ শুনে। তার মাকেও সংবাদ দিয়ে আনা হল। নীলা বেগম কোন কথাই বলতে পারলেন না। কেবল নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে দিতে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন মুর্ছা যাওয়া ছেলের দিকে। এক সময় সৈকতের জ্ঞান ফিরে। সভা সেমিনার করা হল। সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত হল। সৈকতকে সর্বোচ্চ সামরিক পুরস্কারের সম্মানে ভূষিত করা হল। পুরস্কারও গ্রহণ করল সে। কেবল নীলা বেগমের মুখেই আর কোন কথা ফুটাতে পারলো না।
মুনশি আলিম
টিলাগড়, সিলেট

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.