মুহাম্মদ সাখাওয়াৎ আলম চৌধুরী

"বুবু , এইবার কইলাম লাল চুড়ি আনতে অইবো "
"ঠিক আছে বইন, শুধু চুড়ি না তোর পছন্দের লাল জামাও আনমু"
"বুবু, মা কতা কইতে চাই। নও মার লগে কতা কও "
" আইচ্ছা দে মার কাছে "
"কেমুন আছসরে মা ফরিদা ? "
"স্লামালাইকুম আম্মা, আমি বালা আছি মা। তোমরা কেমুন আছো? "
"আমরাও বালা আছি, তয় তুই কি এইবার আইতে পারবি? "
"গেল ঈদে তো আইতে পারি নাই, তয় এইবার আওনের লাইইগা চেষ্টা করমু "
"হ রে মা, তোরে দেহিনা বহুত দিন। তোর বাপে ত খালি তোর কতা কয়। "
"আমরো তোমাগো লাইগ্গা মন কাঁদে মা "
"তই মা, সুবিধা হইলে তোর বাপের লাইগ্গা একখান লুঙি আর পাঞ্জাবি আনিস। "
"ঠিক আছে মা আনুমনে, তই তোমার কিছু লাগবো না? "
"আমার আর কি লাগবো, তুই আইলেই হইবো মা। আর হুন তোর বাপের লগে একটু কতা ক "
"আইচ্ছা দেও "
"কেমন আছিস মা? "
"স্লামালাইকুম আব্বা, আমি বালা আছি বাবা। তুমি কেমুন আছো? "
"আছিরে মা বালাই আছি। তয় তুই এইবার আইতে পারবি তো? "বাবার কথায় এক প্রকার আকুতির ছায়া প্রকাশ পেল। ফরিদা একটু চিন্তা করে বলল, "দেহি বাবা আওনের চেষ্টা করমু "
"হ মা, গত ঈদেও আইলি না, মহাজন টাকার লাইগ্গা বড় চাপ দিতাছে। সকিনাও বাড়িতে আইছে। হের পোলা মাইয়ারেও কিছু দেওন দরকার। " বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ফরিদার বাবা। সেই দীর্ঘশ্বাসটা সোজা এসে লাগলো ফরিদার বুকে।
"ঠিক আছে বাবা তুমি কোন চিন্তা কইরো না, যাইহোক না ক্যান আমি এইবার আমু "
"হ মা তুই আইলে আমার বুকটা শান্তি পায়। আর একহান কতা, পারলে রহিমের লাইগ্গা একটা শার্ট আনিস "
"জ্বী আব্বা ঠিক আছে, তুমি ছিন্তা করিওনা। আমি যাইহোক না ক্যান এইবার আমুই। তোমরা বালা থাকিও। এইবার রাহি আমার ডিউটির টাইম হইছে। "
"ঠিক আছে তুইও বালা থাকিস, ঠিক মতো খাওন দাওন করিস। "
"আইচ্ছা আব্বা, রাহি স্লামালাইকুম.। "এক বুক নিঃশ্বাস ছেড়ে মোবাইলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ফরিদা। এই অলস তাকিয়ে থাকায় সে খুঁজে পেতে চায় হাজারো অনিশ্চিত প্রশ্নের জবাব। কিন্তু সে ভালো ভাবেই জানে এই প্রশ্নের আদৌ কোন জবাব মিলবে না। তবুও নিরন্তর চেষ্টা করে মন এইসব উত্তরহীন প্রশ্নের জবাব জানার জন্য।

ফরিদাকে অন্যমনস্ক দেখে তারই ফ্লোরের সহকর্মী আয়েশা জিজ্ঞাসা করে, "কিরে ফরিদা, তুই লাঞ্চ করবি না? " ফরিদা আরও কিছুক্ষণ নিরব থেকে উত্তর দেয়, "নারে আজ খেতে ইচ্ছে করছে না "

ফরিদা কাজ করে গার্মেন্টসে। এই শহরে এসেছে প্রায় বছর হতে চলল।তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে মেঝ। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে দুইবছর হলো। তাও মোটা অংকের যৌতুকের বিনিময়ে। আর সেটা পূরণ করতে মাহজনের কাছ থেকে মোটা ঋণ করতে হয় তার বাবাকে। বাবা-ই এতবছর ধরে সংসার চালিয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ এক দূর্ঘটনায় তিনি কাজে অক্ষম হয়ে পড়েন। আর এরপর থেকেই সংসারে নেমে আসে দৈন্যতা। মাথার উপর দেনার বোঝা, সেই সাথে সংসারের হালটানা। সবকিছু মিলিয়ে তিনি চোখে ঘোর অন্ধকার দেখতে থাকেন।

শ্বশুরের দুঃখ লাঘব করার জন্য নিজের সুন্দরী শালিকা ফরিদাকে ফুসলিয়ে গার্মেন্টসে কাজ পাইয়ে দেয় তার দুলাভাই। গার্মেন্টসে কাজ করার পর থেকে সংসারে দুবেলা খেতে না পারলেও একবেলার খাবার কোন মতে জুটেছে। এভাবে সবকিছু ঠিক থাকলেও গত চার -পাঁচ মাস নিয়মিত বেতন পাচ্ছে না ফরিদা। গত ঈদেও তার পুরো বেতন -বোনাস মিলেনি তার। যদিও প্রথমে সবারই না মিলার কথা। কিন্তু পরবর্তীতে সবার মিললেও সে সহ যারা বেতন -বোনাসের জন্য একটু উঁচু গলায় ছিলো তাদের মিলেনি এখনো।

এনিয়ে প্রায় বসের সাথে কথা বললেও কোন কাজ হচ্ছে না। কেননা সে কোম্পানির চোখে কালার হয়ে গেছে আন্দোলন করে। অথচ সে তেমন কিছুই জানে না। আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের সাথে একটু খোলাখুলি কথা বলেছে। দোষ বলতে এতটুকু। সে দোষের জন্য রমজানের ঈদে বাড়ি যাওয়া হয়নি। কেননা বেতন পায়নি সে। এবারও বেতন -বোনাসের জন্য কথা বললে কয়েকজন অফিসার খুবই খারাপ ব্যবহার করে। কেউ কেউ সময় বুঝে দূর্বলতার সুযোগ নিতে চায়। ইশারা ইঙ্গিত অনেক কিছুই বলে। আর তাতে সাড়া দিলে বেতন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু অসৎ পথে কোন কিছুই করতে চায় না সে। সৎ পথে থেকেই নিজের জন্য লড়াই করতে চায়। তবে সে জানে তার এই লড়াইয়ে কতদিন নিজেকে সৎ রাখতে পারবে।

সারাদিন অফিস শেষে রুমে ফিরে ফরিদা। কিন্তু রুমেও শান্তির কোন চিহ্ন নেই। কারণ থাকা খাওয়া নিয়ে এখানে প্রচুর দেনা হয়ে গেছে।রুমমেট সীমাতো বলেই দিয়েছে তাকে নতুন কোথাও চলে যেতে। শুধু সীমা নয় প্রায় সবাই তাকে এখন এড়িয়ে চলে শুধু সুইটি ছাড়া। সুইটি তার রুমে সবচেয়ে চঞ্চল হাসিখুশি একটি মেয়ে।আজ পর্যন্ত কেউ তাকে বেজার মুখে দেখিনি। কোন সমস্যাই তার কাছে যেন সমস্যা নয়।

তবে তার পেছনে অনেকে অনেক কথা বলে। এমনকি তার চরিত্র নিয়েও অনেক কথা চালু আছে সব জায়গায়। কি অফিসে কি এলাকায় সবখানেই সবাই ওকে একটু সমীহ করে চলে। তার কারণ কি সে সবার সাহায্যে এগিয়ে আসে তা? নাকি তার সাথে সব বড় বড় স্যার অফিসারদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে সেইজন্য, সেটা কখনো স্পষ্ট নয়।

ফরিদা যথেষ্ট সুন্দরী এবং গোছানো টাইপের মেয়ে। তার দিকে অনেকেরই নজর পড়েছে। কিন্তু ওর জাঁদরেল স্বভাবের কারণে তেমন কেউ আজ পর্যন্ত সুবিধা করতে পারেনি। ফরিদাও বেশ কবার সুইটির কাছ থেকে টাকাপয়সা সাহায্য নিয়েছে। আবার পরিশোধও করেছে। তবে সুইটি সবসময়ই বলতো এতো পরিশ্রম করে সবাই সবকিছু করতে পারেনা। এই দুনিয়ায় চলতে হলে মাঝে মাঝে হাওয়া থেকেও টাকা আয় করতে জানতে হয়।

তবে ফরিদা সুইটির এইসব কথাতে কখনোই গা করেনি। আজ ফরিদার মন খারাপ। অফিস থেকে এখনো টাকা পায়নি। কখন পাবে তার ঠিক নেই। এদিকে কদিন পরই ঈদ। কীভাবে কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। রুমে ঢুকার মুহুর্তে দেখল সুইটিকে একজন হ্যান্ডসাম একটি পুরুষের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে।তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি দামী কার। বুঝতে পারল গাড়িটি পাশের এই লোকটির। ফরিদাকে দেখে ডাক দিল সে, "এই ফরিদা একটু এদিকে আয়। " সুইটির ডাকে সাড়া না দেওয়ার কোন কারণ নেই। তবে কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলা ফরিদা তেমন পছন্দ করে না। তবুও যেতে হলো।

"কি ব্যপার সুইটি আপা, আজকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি এলে মনে হয় ? "যদিও ফরিদা জানে সুইটির জন্য অফিসের টাইম কোন সমস্যা নয়। যখন তখন তার ছুটি মিলে। "হ্যাঁ আজকে একটু তাড়াতাড়ি এলাম। জাহিদ ভাই শপিংয়ে নিয়ে গেল তাই। পরিচয় করিয়ে দেই ইনি জাহিদ ভাই। "বলে সুইটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জাহিদকে ইঙ্গিত করলো। ফরিদা লোকটির দিকে তাকালো না ভালো করে।তবে একটি সৌজন্যসূচক সালাম দিল। সুইটি বলল, 'জাহিদ ভাই এ আমার বান্ধবী ফরিদা। '

ফরিদাকে প্রথম দেখাতেই জাহিদ এমন ভাবে দেখতে লাগলো সে যেন, সে এর আগে কোন সুন্দরী মেয়ে দেখেনি। বিষয়টা ফরিদা মোটেই সহজ ভাবে নিলো না। একজন অপরিচিত মানুষ কিভাবে একটি মেয়ের দিকে এভাবে তাকাতে পারে। তারপরও চোখ বুজে সহ্য করল সে।
'জাহিদ ভাই ফরিদা খুবই ভালো একটি মেয়ে। তবে একটু সোজাসাপটা টাইপের। তাই এখনো নিজের কোন উন্নতি করতে পারেনি।'বলল সীমা। সুইটির কথাটা ফরিদার ভালো লাগলো না। একজন অপরিচিত মানুষের সামনে এভাবে তার সম্পর্কে বলাটা উচিত হয়নি। কিন্তু কিছু করার নেই। সুইটি মেয়েটা এমনই। যখন যা আসে তখন তাই বলে দেয়।

কেন জানি এরপর ফরিদার আর ওখানে দাঁড়াতে ইচ্ছে হলো না। তাই বলল, 'সুইটি আপা আমার ভালো লাগছে না, আমি আসি।" ফরিদা চলে যেতে উদ্যত হলে জাহিদ বলে উঠে, 'আরে কথাই তো হলো না চলে যেতে চাইছেন যে? ' জাহিদের কথায় ফরিদা কিছুই বললো না। সুইটি ব্যপারটা সামলে নিয়ে বলল, 'আসলে সারাদিন চাকরি করে এসে ও খুব ক্লান্ত। আপনি চাইলে সবাই একদিন কোথাও বেড়াতে যেতে পারি।তখন ইচ্ছেমত কথা বলতে পারবেন।'
' আরে এতো কাজ কাজ করলে কি শরীর ঠিক থাকবে? মাঝে মাঝে শরীরকেও কিছু সময় দিতে হয়। 'শেষের কথাটা একটু জোরেই বলল জাহিদ।

কিন্তু তার আগেই ফরিদা এক মুহূর্ত ওখানে না দাঁড়িয়ে চলে এলো রুমে। সারাদিন অফিস তারউপর টাকা -পয়সা নেই। এইসব নিয়ে এমনিতেই তার মাথা হট হয়ে আছে। আর এখন জাহিদের মতো লোকের সামনে নিজের এমন অপমান তার মোটেই ভালো লাগলো না। কিন্তু কিছুই করার নেই। সমাজে চলতে হলে এদেরকে সহ্য করেই চলতে হবে। সুইটি মেয়েটিও কেমন। এমন লোকের সাথে এতো ভাব কিসের? যাইহোক ফরিদা কাপড়-চোপড় ছেড়ে যখন একটু ফ্রি হলো তখন তারই এক রুমমেট শাহনাজ জানালো চাউল নেই। চাউল আনতে হবে। তার কাছে টাকা নেই। সীমা নাকি বলেছে ফরিদা আসলে তাকে বলতে চাউলের কথা। আর সেটাই বললো ফরিদাকে শাহনাজ।

এই কথা শোনার পর ফরিদার মন একদম খারাপ হয়ে গেল। কেননা তার কাছে কোন টাকা-পয়সা নেই। এখন চাউল আনতে গেলে অনেক টাকা লাগবে। তাছাড়া দোকানে তার নামে প্রচুর বাকি পড়ে আছে। এখন সে বলতে গেলে দোকানের আশেপাশেই যায়না। কেননা টাকা দিতে পারছে না সে প্রায় কয়েকমাস। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার দোকানদার বেশ কথা শুনিয়ে দিয়েছে তাকে। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। কার কাছ থেকে এখন টাকা নিবে?

শেষে সিদ্ধান্ত নিল দোকানদারকে আবার একটু বুঝাবে। কেননা তার বেতন যদি কাল পরশুর মধ্যে পায়। তাহলে তার টাকা দিয়ে দিবে। এই কথা বলে হলেও যদি কিছু একটা ব্যবস্থা যদি করতে পারে। এই চিন্তা করেই ফরিদা দোকানে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। তখনই দেখলো যে সুইটি রুমে ঢুকলো। যখন ফরিদাকে দেখল তখন বলল, 'তুই এভাবে না চলে এলেও পারতি। '
'আসলে আমার ভালো লাগছিলো না আপা।'জানলো ফরিদা।
'জাহিদ ভাই খুবই কাজের মানুষ। কোথায় চাকরি করছিস কোন বেতন টেতন নাই। তাকে বললে তোকে একটা ভালো চাকরি পাইয়ে দিতে পারে সে।'খুবই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল সুইটি।
ফরিদা কিছু না বলে চলে যেতে চাইলে সুইটি জিজ্ঞাসা করে, 'কই যাচ্ছিস? '
'দোকানে যাচ্ছি। চাউল নাকি শেষ। '
'বেতন পেয়েছিস? '
'না পায়নি। তবে দিবে দিবে বলছে। '
'তো টাকা ছাড়া তোকে চাউল দিবে কে? '
'দেখিনা, বাকীতে দেয় কিনা। '

সুইটি আর কিছুই বললো না। ফরিদাও চলে গেল। বাইরে এসে দেখে যে গাড়িটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সে ওদিকে তাকিয়ে সোজা চলে গেল মুদির দোকানে। গিয়েই রহমত চাচা কে জানালো যে বাকিতে কিছু চাল দেওয়ার জন্য। বাকির কথা শুনে তো রহমত চাচা খুবই রেগে গেল। রেগে গিয়েই বললো, 'গত তিনমাসের টাকা এখনো পায় নাই। আবার আসছো বাকি নেওয়া জন্য। তোমার কি লাজ শরম নাই। '
রহমত চাচার কথা শুনে ফরিদা খুবই দুঃখ পেল। কেননা রহমত চাচা কখনোই এভাবে কথা বলেন নাই। আজ তার মেজাজ নিশ্চয়ই খুব খারাপ। কিন্তু তিনি যে কথা বলে ফেলেছে তা অনেকেই আশেপাশে শুনেছে। তাই আত্মপক্ষ সমর্থনে ফরিদা বলল, 'কাল পরশু বেতন পাবো চাচা। আপনার সব টাকা একসাথে দিয়ে দিব। '
'অত কথার দরকার নাই। আগের টাকা দাও। তারপর নতুন করে সদাই কেনো। এখন ঈদের মৌসুম টাকার দরকার। আর কথা বেশি বাড়াও না। যাও টাকা নিয়ে আস। '

রহমত চাচার ভৎসনায় ফরিদা খুবই মর্মাহত এবং অপমানিত বোধ করল। দোকানে প্রচুর লোকজন। যদিও সবাই তাকে চিনে না বলে ততটুকু সমস্যা নেই। তারপরও সে একটা মেয়ে। কোন মেয়েই ভরা লোকজনের সামনে এইসব কথা হজম করতে পারে না। তারউপর সবাই আড়চোখে তার দিকে উৎসাহ নিয়ে তাকাচ্ছে। তার দিকে যারা তাকাচ্ছে এবং এতক্ষন যারা এইসব দেখছিল। তাদের মধ্যে জাহিদ সাহেবও ছিলো।

তিনি এতক্ষন দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলেন। ফরিদা যখন অপমানিত হয়ে ফিরে আসছিল। তখন তিনি পিছন থেকে ডাক দিলেন, 'ফরিদা একটু দাঁড়ান। '
ডাক শুনে ফরিদা যখন পিছনে তাকাল তখন জাহিদকে দেখতে পেল। জাহিদকে দেখে মাথা নিচু করে ফেলল সে। কেননা জাহিদ তার পেছন পেছন ঐ দোকান থেকেই আসছে। তারমানে সে দেখেছে যে সে অপমানিত হয়েছে। এতোকিছুর পরও ফরিদা মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে রইলো।
'আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমি কি আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারি? '
ফরিদা খুব ভালো করেই জানে যে এই কঠিন জগতে কেউ কাউকে এমনিতেই সাহায্য করতে চাইনা। তার উপর ওর মতো অপরিচিত কোন মেয়েকে। নিশ্চয়ই কোন না ধন্দা রয়েছে এই জাহিদ সাহেবের। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার অবস্থা ফরিদার নেই। একদিকে টাকা -পয়সা নেই। সবার কাছ থেকে ধার করতে করতে গলা পর্যন্ত হয়েছে। তারউপর এই অপমানের পর আর কি বলার থাকতে পারে? তাই একটু সাহস নিয়েই ফরিদা বলল, 'আপনি কেন আমাকে সাহায্য করবেন?'
'কেন আমি কি মানুষ নই? একজন মানুষ কি একজন মানুষকে সাহায্য করতে পারেনা? '
'আপনি কি এই শহরে হাজী মুহাম্মদ মহসিন হয়েছেন, যে জনে জনে সাহায্যে করে বিলাবেন? 'কথাটা একটু ক্ষোভ থেকেই বললো ফরিদা।
'আহ হা আপনি আমাকে এভাবে নিচ্ছেন কেন, দেখুন আপনি আমার পরিচিত তাই সাহায্য করতে চাইলাম। '
'এটা আপনি কি বললেন! মাত্র কিছুক্ষণ আগেই আপনার সাথে দেখা। তাও ভালো করে কথাও হলোনা। আর এখনই বললেন পরিচিত! আর ভালভাবে কথা -বার্তা চললে তো আরোও বেশী কিছুই মনে নিয়ে বসে থাকবেন। 'কথা গুলো এমন ভাবে বলল যে সমস্ত রাগ সব জাহিদের উপর ঝাঁড়লো। ফরিদার বুকে থাকা সব দুঃখ বেদনা গুলো এই একজনের উপর নিক্ষেপ করে যেন শান্তি পেল ফরিদা।

রুমে এসেই ফরিদা সুইটির কাছে গেল। সুইটি ফরিদাকে দেখেই বুঝতে পারল যে কিছু একটা হয়েছে। সুইটিকে পেয়ে ফরিদা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করল। সুইটি তাকে বুকে দুহাত দিয়ে চেপে রাখে কিছুক্ষণ। তারপর ওর মুখ তুলে সুইটি বলল, 'কি ব্যাপার, কান্না করছিস কেন?
ফরিদা কিছুই বলতে পারছে শুধুই কান্না ছাড়া।

একসময় ফরিদা কান্না থামিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলে। আর সুইটি ভালো ভাবেই বুঝতে পারে ফরিদা খুবই বিপদে আছে। কেননা টাকা পয়সা ছাড়া একটি মেয়ে শহরে বেঁচে থাকা সত্যিই অসম্ভব।

এরপর সুইটি নিজেই চাল নিয়ে আসে। এর ফাঁকে জাহিদও এক দফা সুইটির সাথে কথা বলে নেয় ফোনে । পরে সুইটি ফরিদাকে বলে যে এই চাকরি টা ছেড়ে দিতে। কেননা বেশ কয়েকমাসের টাকা যেহেতু জমে আছে, তাই বুঝা যাচ্ছে যে এরা টাকা দিবে না। আর দিলেও অনেক ঘুরাঘুরি করাবে। আর কয়েকদিন বাদে ঈদ। এই ঈদে যে টাকাটা যে পাবে না সেটা নিশ্চিত।

পরের দিনও ফরিদা কাজে যায়। কিন্তু আশা জাগানিয়া কোন খবরই সে পায় না। বরঞ্চ অফিস কর্তাদের হাবভাব দেখে সে পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যে, এই ঈদেও তার বেতন হবেনা। কিন্তু বেতন না হলে সে নিজে চলবে কিভাবে আর বাড়িতেই বা যাবে কিভাবে? জীবনযুদ্ধের অনেক হিসাব নিকাশ তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। কিভাবে সে এই কষ্টের যাঁতাকল থেকে মুক্তি পাবে।

ফরিদা মনে মনে স্থির করে নেয় যে এখানে এসে আর লাভ নেই। যে করেই হোক তাকে অন্তত কিছু টাকা যোগাড় করে হলেও বাড়ি যেতে হবে। কেননা তার পরিবার এখন প্রতিটি রাত পার করছে নতুন একটি সুন্দর সকাল আসবে বলে। তাদের চোখে এখন সোনালী স্বপ্ন খেলা করছে। যে স্বপ্ন ফরিদা তাদেরকে এনে দিতে পারে। কিন্তু ফরিদা নিজেই জানে না সেই সোনালি প্রভাত রাঙা স্বপ্নের ঠিকানা কোথায়?

ঈদের বাকি মাত্র দুদিন। ফরিদার বাড়ি থেকে ওর বাবা ফোন করেছিল। তার কন্ঠে ছিলো করুন আকুতি। বাবার হৃদয় নিংড়ানো হাহাকার ফরিদাকে ঠিক সেই ভাবে বিদ্ধ করল, যেভাবে রাস্তায় পড়ে থাকা জীর্ণশীর্ণ কুকুরকে কেউ এসে আঘাত করে । যে আঘাতে তার ইচ্ছে থাকলেও সরে যেতে পারে না। শুধু পড়ে পড়ে আঘাত সহ্য করা ছাড়া। বাবার চরম আত্মবিশ্বাস তার ভিতর আরও বেশী দ্বায়িত্ববোধের জন্ম দেয়। যে দ্বায়িত্ববোধ থেকে মানুষ নিজের অবস্থান ভুলে যেতে বাধ্য হয়। ভুলে যায় তার নিজের অস্তিত্ব। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় লোপ পেতে থাকে ভালো মন্দের বিচারবুদ্ধি।

আজ আর ফরিদা কাজে যায় না। রুমেই পড়ে থাকে। তার বিষন্ন মনোভাব দেখে সুইটি আন্দাজ করতে পারে সত্যিই মেয়েটি অসহায়। আর এই অসহায়ত্বের সুযোগই মানুষেরা নিয়ে থাকে। যা সুইটি অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করছিল। তাই সুইটি সরাসরি ফরিদাকে জানায় জাহিদ ভাইয়ের কথা। জাহিদ নাকি রাজি হয়েছে কোন একটা কোম্পানিতে তাকে চাকরি দেওয়ার। তবে এর কিছু বিনিময় অবশ্যই আছে। কিন্তু সুইটি কিছুই খুলে বলে না। এক পর্যায়ে ফরিদা জানতে চায়, 'এখন তো সব কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে। আমি কাজে যোগ দিলেও তা ঈদের পরে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি টাকা কিভাবে যোগাড় করব? '
'সেই চিন্তা জাহিদ করেছে। তাই তিনি আজ বিকেলে তোর জন্য কিছু টাকা নিয়ে আসবে। আশাকরি এতে তোর সবকিছু হয়ে যাবে। '
'কিন্তু উনি কেন টাকা দিবেন? '
'সেটা উনিই ভালো বলতে পারেন। তবে তোর এই মুহূর্তে সামনে যে সমস্যা সেটা মোকাবেলা করা দরকার। বাকিটা পরে দেখা যাবে। '
'কিন্তু আপা কেউ কাউকে শুধু শুধু সাহায্য করে না। '
'শুধু শুধু কেউ যে কিছু করে না সেটা তুই ও জানিস আমিও জানি। কিন্তু এই সাহায্য নেওয়া ছাড়া আমাদের কি অন্য কোন উপায় আছে? '
'না আপা, আমি এই টাকা নিতে পারব না। '
'না নিলে না নিবি। কোন সমস্যা নেই। কিন্তু না নিলে কি তোর সমস্যার সমাধান হবে? এই আমাকে দেখ, কতকিছু করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাহায্য ছাড়া কিছুই করতে পারিনি। তুই কি পেরেছিস তোর টাকা উদ্ধার করতে? পারিস নি। আর এটাই বাস্তবতা। আমি সাহায্য নিয়ে চলছি বিধায় আজ এইভাবে থাকতে পেরেছি। '
'আমি জানি না আপা আমি কি করব। ' বলেই ফরিদা হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। সুইটি তার অবস্থা বুঝতে পেরে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিতে চেষ্টা করল।

কিন্তু সুইটি নিজেও জানে যে এই কান্নার কোন শান্তনা নেই। এই কান্নার শুরু আছে কিন্তু শেষ কোথায় সেটা সেও জানে না। তবুও এই কান্না থামাতে হবে ক্ষণিকের সুখের দেখা পেতে হলে। কেননা এই কান্নার বিনিময়েই তাদেরকে সবার সুখ কিনতে হবে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সম্পর্কের ভালবাসা গুলো টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের প্রতিনিয়ত নিজেদের বিসর্জন দিতে হয়। আর এই বিসর্জন একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম করে দিতে হচ্ছে। যা নশ্বর বসুন্ধরা যতদিন টিকে থাকবে ততদিন চলতেই থাকবে।

বিকেলের সুন্দর গোধূলি লগ্নের মুহূর্তে জাহিদ ভাই বেশ কিছু টাকা নিয়ে দেখা করতে আসে ফরিদার সাথে। এর আগে জাহিদের সাথে সুইটির কথা হয়। আর সবুজ সংকেত পেয়েই জাহিদ খুশি মনে চলে আসে। তবে তারা দেখা করে পার্কে। তারা তিন জনই বসে আছে একটি বেঞ্চিতে। ফরিদা সুইটি পাশাপাশি। সুইটি জাহিদের সাথে হালকা পাতলা কথা বলছে। তবে ফরিদার মুখে কথা নেই। অতিরিক্ত কান্নার কারণে ওর চোখ গুলো ফোলা ফোলা। স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে যে সে খুবই আতঙ্কিত। কিন্তু কোন কিছুই যেন আর করার নেই।

কথার এক ফাঁকে জাহিদ টাকাটা ফরিদাকে তুলে দেয়। কিন্তু ফরিদা কোন কথা বলে না। নিঃশব্দে টাকাটা নেয়। টাকা নেওয়ার পর জাহিদ বলে,'সুইটি, তোমার বান্ধবীর খুবই মন খারাপ! '
'না ভাইয়া ও কিছু না। আসলে এই কয়েকদিন অনেক ঝামেলায় ছিলো তো, তাই একটু মুড অফ। 'সুন্দর করে বলল সুইটি।
জাহিদ এবার ফরিদার দিকে চেয়ে বলে,
'ফরিদা তুমি এভাবে ভেঙে পড়ছ কেন? তুমি বিপদে পড়েছ তাই তোমাকে সাহায্য করলাম। আর যখন সময় হবে তুমি আমাকে সাহায্য করবে। এখানে এসে এভাবে মুড অফ করে থাকাটা মানায় না। '
জাহিদের কথাতেও ফরিদার অবস্থার পরিবর্তন হয়না। তাই সুইটি বলে, 'জাহিদ ভাই চলেন আজকে আমাদের ফুচকা খাওয়াবেন। '
'আরে আমি তো সবসময়ই চায় তোমাদের খাওয়াতে। কিন্তু আপনাদেরওতো মুড থাকে না কিছু খাওয়ার। 'শেষের কথাটা ফরিদার দিকে ইংগিত করেই বলল জাহিদ। এই কথার পর সুইটি বলে উঠল, 'এই ফরিদা চল। অনেকক্ষণ ভাব নিয়ে বসে আছিস। এবার চল কিছু খাব। '
কিন্তু ফরিদার কোন ভাবান্তর হয়না। যখন দেখে যে ফরিদা সত্যিই বিষন্ন। তখন সুইটি ওর হাত টান দেয়। তখন ফরিদা বলে, 'আপা আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তোমরা যাও। আমি কিছুক্ষণ এখানে বসে বাসায় চলে যাবো। '
'এটা কোন কথা হলো! জাহিদ ভাই কিছু খাওয়াতে চাচ্ছে। আর তুই এভাবেই বসে থাকবি। কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। '
'আপা, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। আমার কিছুই ভালো লাগছে। প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দাও, প্লিজ। ' কথা বলতে বলতেই ফরিদা কান্না শুরু করে দিল।

সুইটি বুঝতে পারল যে ফরিদার সত্যিই খুব মন খারাপ। তাই সে ওকে আর ঘাটাতে চাইলো না। জাহিদকে সাথে নিয়ে সুইটি ফুচকা খেতে চলে গেল। আর ফরিদা বসে রইলো একাকী। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মনে হলো এই সন্ধ্যা আলোর আঁধার মাঝামাঝির একটি নিরব ক্ষণ।চারদিকে একটা হালকা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যেতে লাগলো। সেই শীতল হাওয়ায় শুকিয়ে যেতে লাগল ফরিদার নিরব অস্রু বিন্দু সমূহ। যে অস্রু বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে উছলে পড়ছে তোর ক্লান্ত চোখের কোণায়।

"নিজের অজান্তেইই কেদে চলছে সে। নিঃশব্দ এ কান্নার কোন নিদিষ্ট কারণ নেই। আবার হয়তো অনেক কারণইই আছে। সমস্ত কারণের কারণেই আজ তার বুকফাঁটা কান্না। যা আমাদের সাদাকালো সমাজে আমরা দেখি না। আবার হয়তো খুব স্পষ্ট ভাবেই দেখি। কিন্তু আমাদের চোখের রঙিন চশমার কারণে তা এড়িয়ে চলি।

জাহিদের দেওয়া এই টাকাগুলো ফরিদা খুব শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। কেননা এগুলা কোন টাকা নয়। এগুলো কিছু স্বপ্নের সমষ্টি। এগুলো কিছু হাসির উপকরণ। এগুলো কিছু ভালবাসার নিবিড় সেতুবন্ধন। অঝোর ধারায় বয়ে চলা কান্নার প্লাবনে ভিজে যায় টাকার খামটি। সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তার মন এখন চলে গেছে বোনের লাল জামার উপর সবুজ কাজ করা ওড়নার দিকে। বোনটি সবুজ মাঠের ভঙ্গুর প্রান্তরে হাওয়ার সাথে উড়ে যাচ্ছে তার দেওয়া সবুজ ওড়না উড়িয়ে।

একটি শ্বাসরুদ্ধ একবুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ফরিদা। সন্ধ্যার ঘনিয়ে পশ্চিমাকাশে লাল আভা দেখা যাচ্ছে। সেই আভার দিকে চেয়ে দেখে একপলক সে। হতে ধরে থাকে সেই স্বপ্ন পূরণের চাবি। সে জানে এখনো কোন পথের দিকে তার যাওয়া উচিত। আজ তার পথ দুটি দিকে বেঁকে গেছে। যে পথে গেলে দেখা মিলবে সমস্ত সুখ আর ঐশ্বর্য ভরা জীবনের। যেখানে তার ভাইবোনদের সদা উজ্জ্বল হাসি থাকবে দিব্যমান। যেখানে থাকবে না বাবার ক্লানিমাখা মুখে হতাশার চিহ্ন। যেখানে মায়ের হাতে থাকবে পরম আদরের ভালবাসার ছোঁয়া। যেখানে এই নশ্বর পৃথিবীতে কেনা যাবে সব সুখ কিছু একান্ত সময়ের বিনিময়ে।

অন্য পথটি খুবই স্পষ্ট দিনের আলোর মতো। যেখানে মানবতার কোন চিহ্নমাত্র নেই। যেখানে সদা হাহাকার নিরব ক্রন্দনের অস্রুর জলে। যে পথে সুখ নেই। নেই কোন গ্যারান্টি জীবন নিয়ে বাঁচার। যেখানে ভালবাসার সম্পর্ক গুলো চরম দায়বদ্ধতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয় প্রতিনিয়ত। যে পথের শেষে কোন ঠিকানা নেই। যে পথের শেষ হতাশা আর গ্লানির বিপর্যস্ত জীবন মৃত্যুর অনিশ্চিত উপাখ্যানের মতো।

ফরিদা এখন পা বাড়ায় সামনের দিকে। আমরা জানি না সে কোন পথে যাবে। সে কি জাহিদের টাকা ফেরত দিবে? নাকি তার সোনালী সময়ের বিনিময়ে কিনে নেবে কিছু দুঃখী মানুষের মুখের হাসি। আমরা কিছুই করতে পারি না সেই সব ভাগ্যহীন ফরিদাদের জন্য। শুধু মাত্র তাদের পথের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া।

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.