বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। মামা রুবজ এ রহমান তখনো বিয়ে করেন নি। সারারাত জেগে জেগে দেখতাম মেয়েদের সাথে কথা বলতে। আর খালি মোবাইলে চুমুর ঝড় তুলতেন! শচীন টেন্ডুলকারের ক্রিকেটে যেমম সেঞ্চুরির রেকর্ড আছে, তেমনি আছে মামার প্রেমের! একবার এক ঘটনার কথা আমার মনে আছে। সেদিন সকালবেলাতে আমার রুমে এসে তিনি বললেন- ভাগনা...
- জি মামা
- এডভেঞ্চার ওয়াল্ডে চল
- আমি রসিকতা করে বললাম প্রেম ওয়াল্ড থাকতে এডভেঞ্চার ওয়াল্ডে কেন?
মুচকি হেসে বললেন- বরাবরের মত প্রেমের চকিদারি করবি! আমি কিছুটা গাধামি ভাব নিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম
- বিনিময়ে...?
- বল কী চাস?
- বলার সাহস পাচ্ছি না
- নির্ভয়ে বল
- আপনিও যদি একবার আমার দায়িত্বটা পালন করতেন...
- নাউযুবিল্লাহ! ... ভাগনা, তুই তো দেখি ব্যাটা পাক্কা বদমাশ হয়ে গেছত!
- আপনার মত আর পারলাম কই…

বলতেই হালকা একটু কানমলা দিয়ে বললেন -আর পাকামো নয়। রেডি হও। আমিও রেডি হচ্ছি। ঐ যে সুনামগঞ্জের মেয়ে ফেসবুকে... নীল জামা পড়া...

বলেই তিনি হাসতে হাসতে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। কত নম্বর প্রেমিকার সাথে যে দেখা করতে যাবেন তার হিসেবটা তিনি কখনোই আমাকে দেন না। তবে আমার চকিদারির হিসাবে মনে হচ্ছে এটি ১০১তম হবে! মাঝে মাঝে মনে হত - ইস! যদি মামার মত পারতাম!

আমি আর কালবিলম্ব না করে ভাল একটি টি শার্ট খুঁজতে লাগলাম। সব টি শার্টের মধ্যে ময়লার যে বিচ্ছিরি অবস্থা কোনটাকেই নিতে ইচ্ছে করছে না। একবার মনে হল আমার আবার ভাল টি শার্টের দরকার কী? আমি তো চকিদারি করার জন্য যাচ্ছি! অতএব একটা হলেই হল। পুরাতন একটা টি শার্ট পড়লাম। এরই মধ্যে মামা এসে পড়ল। এসেই বলল- দেখত আমার মোবাইলটার চার্জ শেষ হয়েছে কি না? আমি ভাল করে দেখলাম মোবাইল বিন্দু পরিমানও চার্জ হয় নি। চার্জ হবে কীভাবে- মামা তো সুইচই অন করে যান নি!

আমি বললাম-মামা, আজ না হয় আমারটা দিয়েই চলেন। মামা আর কথা বাড়ালেন না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন বেশ। তবে তাই হোক।

-হা
-চিনবেন তো?
-হা
-কীভাবে?
-নীল জামা পড়া থাকবে।
-বেশ তো... চিনলেই হল।

মিনিট বিশেকের মধ্যে আমারা এডভেঞ্চার ওয়াল্ডে এসে পড়লাম। মোটর বাইক থেকে নেমে একটু হাঁটার পর মামা বলল- তোর মামি কিন্তু বসে অপেক্ষা করছে। ঐ যে দেখ...

আমি দেখলাম সত্যি সত্যি নীল জামা পরিহিত একজন মেয়ে ঝোঁপের একটু আড়ালে অপেক্ষা করছে। মামার মধ্যেও বেশ একটু চাঞ্চল্য লক্ষ্য করলাম। আমাকে একটু আস্তে আস্তে বলল -তুই ঐখানটাতে গিয়ে দাঁড়া। খেয়াল রাখিস। আগের মত মানুষ আসলে সংকেত দিস কিন্তু! আমি শুধু নীরবে ঘাড় নাড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, ইস! চৌকিদারিতে যদি নোবেল দেয়া হত!

মামা চলে গেল নীল জামা পরিহিত ঐ মেয়ের কাছে। মেয়েটি উল্টোদিকে মুখ করে ঘুরে ছিলো। মামা তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। এরপর দেখলাম আকষ্মিক এক কাণ্ড। মেয়েটি নিজেকে ছাড়িয়ে জোড়ে চিৎকার করলো এবং পা থেকে জুতা খুলে মামার গালে... ! টিনের চালে কাক, আমি তো অবাক!

মুহূর্তেই আশেপাশের অনেকেই ছুটে আসল। একলোক এসে তো মামার চুলে ধরে এলোপাথারি মারতে শুরু করলেন। মামা বলতে লাগলেন, আমি সরি আছি। আজ আমার প্রেমিকারও এই পোশাকে আসার কথা। কিন্তু কে শুনে কার কথা! কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না। এলোপাথারি মারতেই লাগলো। কেউ কেউ বলতে লাগলো- এই বদমাশ ইভটিজারকে পুলিশে দেই- আবার কেউ বলতেছে না। আরও কিছু উত্তম-মধ্যম দিয়ে ছেড়ে দেই। অবস্থা বেগতিক দেখে আমি দৌঁড়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে মুরব্বীর মত একটু ভাব নিয়ে বললাম উনি আমার পরিচিত। সত্যি সত্যি ওনার আজকে ইয়ে... এবং এটি নিছক দুর্ঘটনা মাত্র। কিন্তু কেউ বিষয়টা ভাল চোখে নিল না। অকালতত্ত্বজ্ঞানী ফটিকের মত মনে করলো। ফলশ্রুতিতে দেখলাম তাদের কেউ কেউ আমাকে তো বদমাশের চেলা বলে গালি দিচ্ছিলই উপরন্তু আমার উপরও চড়াও হওয়ার জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

এমন সময় গ্রীষ্মের একপশলা কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির মত নাটকীয়ভাবে হাজির হলেন মামার সেই নীল জামা পরিহিত প্রেমিকাটি। রাজনীতিবিদদের মত ভরাট গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন-থামেন আপনারা! অযথাই ওনাকে মারছেন। এটা আসলেই একটি কাকতালীয় ঘটনা। মামার ১০১তম প্রেমিকাটির ভাষণ আমার কাছে হিটলারীয় সেরা ভাষণের মত মনে হল!

মনে মনে এও ভাবতে লাগলাম আজকের যুগে বক্তৃতার প্রতিযোগিতা করলে কোনভাবেই হিটলারের সেরা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না! যাইহোক, তখন উপস্থিত কারোরই আসলে সত্যিকার ঘটনাটা বুঝতে বাকী রইলো না। কিন্তু ততক্ষণে মামার অবস্থা বড়ই করুণ! উপস্থিত জনতা মেয়েটির কাছে সরি বলে যে যার যার মত চলে গেল।

মুনশি আলিম
বোরহানবাগ, পূর্ব শিবগঞ্জ, সিলেট

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.