ফারুক ওয়াসিফ
যৌনসুখই সুখের রাজা। ষাটের দশকে বামপন্থিরা যখন ‘অর্থনৈতিক মুক্তিই আসল মুক্তি’; বলে লাখো-হাজারে জীবন দিচ্ছে, তখন পশ্চিমা–মুক্তির উকুন তরুণ–তরুণীদের মাথায় হুল ফুটিয়ে গেঁথে দিচ্ছে অন্য মন্ত্র: মুক্ত প্রেম মুক্ত মানুষ ও মুক্ত সমাজের জন্ম দেয়‍। এটাই ছিল পাশ্চাত্যের যৌনবিপ্লবের বীজমন্ত্র। ষাটের দশকের রাজা হলো এই ‘যৌনতা’।
আমাদের দেশে যৌন স্বাধীনতা না এলেও প্রথম কনডম ব্র্যান্ডের নাম হলো ‘রাজা’। মুদির দোকানে দোকানে রাজা কনডমের প্যাকেট বয়ে আনলো যৌনমুক্তির হাতছানি: ইহা নিরাপদ ইহা আরামদায়ক!
পঞ্চাশ বছর পর জার্মান যৌনবিদ Volkmar Sigusch বলছেন, তাঁরা বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন। তিনি সেসমযের যৌনবিপ্লবের প্রবক্তাদের অন্যতম। ‘‘বলা হয়েছিল যৌনমুক্তি সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তিও ডেকে আনবে, পুঁজিবাদও শেষ হবে, সেটা ছিল অতিকথা। যৌনতাকে কৃত্রিমভাবে ‘রাজা’ বানানো হয়েছিল। বাস্তবে সেই মুক্তি আসেনি’’ উপলব্ধি তাঁর।
ওদিকে তুর্কি–জার্মান মুসলিম নারীবাদী সেইরান আতেস মুসলিম দুনিয়ার যৌনমুক্তি চান। মধ্যপ্রাচ্যে বালক থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই কবিতা লেখে, তাদের সবার বিষয় একই: বাসনা। তাই বাসনার মুক্তির ডাক দিয়েছেন তিনি। কথা মিথ্যা না। বলিউড আর টিভি ও বিজ্ঞাপন সে ডাকে সাড়া দিয়েছে! আজকের যুগে রাজনীতি পল্টনে হয় না, হয় ভিজ্যুাল পর্দায়। ছেলেমেয়েরা মায়ের পেটে জন্মালেও বড় হয় কনজিউমারিস্ট কালচারে। কালচার মা, পুঁজি বাপ।
কিন্তু কোন ধরনের যৌনতা? সিগুশ সাহেব বলছেন, পশ্চিমে শিল্পিত যৌনতার ধারণা গড়ে ওঠেনি, ওটা আছে ভারতবর্ষে বা জাপানে। এখানে শুধু যান্ত্রিকভাবে ছিদ্রসন্ধানী খরগোশের দাপাদাপি। মিশেল ফুকো মশায়ও বলেছিলেন, আনন্দবিদ্যা বা আর্‌স ইরটিকার পথে পাশ্চাত্য যায়নি। না যাওয়ার ফলে কী হয়েছে, তা আমাদের দেশে যৌনমুক্তির অবতার করপোরেট লাইফ স্টাইল শেখাচ্ছে।
সেই জগতের দেশীয় টাইকুন আড়ং বলছে, যৌনতাকে আলগা করো, স্বাধীন করো। দেহকে ইনস্ট্যান্ট ন্যুডল বানাও, অল্প পানিতে স্বল্প তাপে সেদ্ধ হও, পরিবেশন করো। ষাটের বাঙালি আধুনিক মডেলনারী বলতো, ‘আমাকে দেখো’। এখনকার বিউটি বিজনেসের এটিএম মেশিন বলে, ‘আমাকে ধরো’। ‘দেখা’ আর ‘ধরা’র মধ্যে পূর্বরাগের পর্বটা ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু এই ‘ধরা’ যে ‘করা’র ইঙ্গিত আনে তা এমনই যে পার্লার-প্যাকেট খুললে দেখার দৃশ্য মুছে যায়, থাকে শুধু যান্ত্রিক ‘করা’র অপশন। এবং সেই অপশনটা মিডিয়া-মুঘল, ফ্যাশন-হালাকু আর লাক্স-পন্ডসের হিটলারদেরই অগ্রাধিকার। সৌন্দর্যবণিকদের কবলে পড়ে কতজন কীভাবে নিঃশেষিত ও ব্যবহৃত হয়েছেন, তা তো ওপেন সিক্রেট।
বাংলাদেশের অ্যাড ফার্মগুলোর মনে হয় আরস ইরটিকার ধারণা নাই। যৌনতা তাদের বস্তু সহযোগে পরিবেশন করতে হয়। ঘরভর্তি পানিতে নৌকায় সিক্ত জিরো ফিগারের নারীর জলকেলিময় বাসরের অপেক্ষা, শুভ্র তাগা পরিহিত দুই কিশোরীর দিকে একটি পুরুষ বকের দীর্ঘ শক্ত চঞ্চু নারী দুজনের মধ্যাঙ্গের দিকে বাড়িয়ে রাখায় সতীচ্ছেদের মোটিভ, কে বোঝে না? (গ্রিক ও ভারতীয় মিথে মর্তের নারীদের ভোগের জন্য দেবতারা বিভিন্ন প্রাণীর বেশ ধরে তাদের অগোচরে বা জোর করে ভোগ করতেন। এটা সেটাই মনে করিয়ে দেয়।) গরুর গাড়ির বাঁশমহলে মেলে ধরা দুই তরুণী, কিংবা পানির লাইনের ফিটিং মিস্ত্রির ফিটিংয়ের কারিগরি হলো তাদের কল্পনার দৌড়। আড়ংয়ের দুধের বিলবোর্ডে বিশালবক্ষা টিশার্ট ঘেঁষা ফুটবলের ছবিও আমরা দেখেছি। পথের ঝালমুড়িঅলার চোঙা ফুকে দুই তরুণী কী বলছে এই ছবিতে? যে তারা হট এবং স্পাইসি, নয় কি? সজ্ঞানে না বুঝেন, আপনার পুরুষালী অচেতনে এর ছাপ পড়ে, আর আপনি অবলোকনকাম চরিতার্থতার প্লেজার পান।
এই বিউটি বিজনেস ছেলেমেয়েদের মধ্যে অল্পবয়সেই নিজের স্বাভাবিক রং আর গড়নকে ঘৃণা করতে শেখাচ্ছে। তাকে আজীবনের জন্য হীনম্মন্য করে তুলছে। শাদা হতে বলে, জিরো ফিগার হতে বলে, ঝলমলে হতে বলে তাকে রোদ–মাটি–জীবন থেকে দূরে ঠেলে, অলিম্পাসের অলীক সুন্দর দেবদেবীদের পূজা করতে শেখাচ্ছে। গ্রেকো–রোমান–আরিয়ান সুন্দরের আদর্শে গড়া হেলেন–ভেনাস–ঊর্বশীরা ছাড়া বাকি সবার খুঁত ধরার সৌন্দর্যবাদ নির্জলা বর্ণবাদ। অবশ্য এখন অরিয়েন্টাল সুন্দর দেখাবার ট্যুরিস্ট ভোলানো পোস্টমডার্ন এক্সোটিসিজম খাওয়ানোও চলছে। কী যেন বলে, ও এথনিক, আড়ংয়ের আছে তারও একচেটিয়া।
এই বিউটি বিজনেসের মূল কথা, তুমি ত্রুটিপূর্ণ প্রডাক্ট, তোমার নিজের মুখ ও ভঙ্গি বলে কিছু নাই। তোমাকে আমরা সারিয়ে, বানিয়ে, কেটেকুটে যা বানাব, সেটাই হবে সত্যিকার ‘তুমি’। অনেক ‘আমি’ই তাই ‘তোমার’ মতো হতে না পেরে বিষাক্ত প্রসাধন আর ক্ষতিকর আয়োজনে দেহ পেতে দিচ্ছে। কী ভয়ংকর চিন্তা! আমার মা–বাবা গরিব বলে, আমার মা–বাবা কালো বা খাটো বলে ‘আমি গরিবের মতো দেখতে কালো ও খাটো’। সব দোষ জন্মের! এর থেকে বর্ণবাদী ও শ্রেণীঘৃণার সৌন্দর্য রাজনীতি আর কী হতে পারে?
মোবাইল কোম্পানিগুলো তো আরো এক কাঠি সরেস, তারা রাতের আলাপের পাঠ দিচ্ছে, হারিয়ে যেতে বলছে। একটা বিজ্ঞাপনে রবি দেখাচ্ছে ইন্টারনেটের স্পিডের তালে তালে তরুণীর ইরটিক প্লেজারের তীব্রতা বাড়ার মুখভঙ্গি। কিংবা জানাচ্ছে, সেক্সি শাকিরাকে ডাউনলোড করার আরামের কথা। যৌনতা আর যন্ত্র, ইরটিসিজম আর এলিটিজম একাকার হয়ে যায় এসব বিজ্ঞাপনে।
পশ্চিমা পর্নোগ্রাফি এখন ঘরে ঘরে যৌনচর্চার ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাটক্টরের ভূমিকা নিয়েছে। যৌনতা নিছক যান্ত্রিকতায় পর্যবসিত হলে, যন্ত্রের মতোই অচিরেই এর দম ফুরাবে। তখন আখ চিপে রস বের করার জন্য নতুন নতুন সুখের মাড়াইযন্ত্র লাগবে, ৬৪ কলাতেও মিটবে না ক্ষুধা। এবং একসময় যৌনতার মধ্যে সবই থাকবে, কেবল নর–নারীর শিরা–উপশিরা–হৃদয় উপচানো মিলন হবে না; ‘বুনো শুয়োর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা, কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না’। ঘষাঘষি ধাক্কাধাক্কির মিলন শেষে ফুরিয়ে যাওয়া মানুষেরা মুখ ফিরিয়ে বিপরীত দেয়ালে মনে মনে মুরগি আঁকবে। এর থেকেও তো যৌনতার মুক্তি দরকার।
নারী–নরের অবৈরী যৌনতার চর্চায় প্রেমময় ইতরামি–বিতলামি থাকবে, কিন্তু সকল নারীকে সেই আদলে দেখানোর অধিকার এইসব ব্যাটাদের কে দিয়েছে? সকলের যৌনরুচি এরাই ঠিক করে দেবে?
আড়ং বা গ্রামীণের মতো কোম্পানি কেন এগুলো প্রেসক্রাইব করে? করে যৌনতাকে পণ্যপূজার সাথে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি বন্যার আমেজে সেক্সি মডেল খাড়া করার জন্য বন্যাদুর্গতদের পরিহাসের অভিযোগে থামবো না। আমার অভিযোগ, যে মানুষের জীবনে স্বস্তিময় যৌনতার সুযোগ নাই, আমাদের আশি–নব্বই ভাগ তরুণ–তরুণী থেকে শুরু করে সমান অনুপাতের সব বয়সী সাবালকদের যৌনতা উদযাপনের অবকাশ সামর্থ্য ঘর–বাহির নাই যেখানে, সেখানে এরকম রগরগে প্রলোভনে তাতানোর অর্থ কী? অর্থ হলো, অর্থ খরচ করে পন্য কিনুন। এগুলোর সেক্সি ডিজাইন ও রসাত্মক ব্যবহারে আপনি সুখী হবেন। পাশ্চাত্যে হয়েছে অবজেক্ট ফেটিশিজম, এখানে তা আরো প্রাথমিক প্রডাক্ট–ফেটিশিজমের হাতেখড়ি দিচ্ছে। বলা দরকার, পাশ্চাত্যের ক্ষমতাশালীরা যা প্রচার করে, তা নিশ্চয়ই পাশ্চাত্যের একমাত্র রূপ না। কিন্তু গুণের চাইতে দোষটাই সংক্রামক এবং দোষ ছড়ানোর এজেন্সিই বেশি সক্রিয়।
পুঁজিবাদ প্রেমের জায়গায় নিয়ে এসেছে নিদায় ভোগের দেওয়া–নেওয়া। তরল আধুনিকতা সম্পর্ককে আনপ্লাগড করে নিয়ে সুখের তরে গমন ও সুখশেষে নিষ্ক্রমণের সবক দিচ্ছে। এখন আর মন আর দেওয়া–নেওয়া করার বালাই নাই, অর্থাৎ তোমার মধ্যে আমি আর আমার মধ্যে তোমার বসতি গাড়ার বোঝাবুঝির ঝামেলা নাই, সর্বঅঙ্গ জ্বলে মোর (তোমার) সর্ব অঙ্গ লাগি’ নাই। এখন অঙ্গ জ্বলে যে কোনো অঙ্গের লাগি। দেহমনের এই অভেদ ছুঁড়ে ফেলে যৌনতাকে নিছক লিঙ্গের বিষয় বানানো হলো মুক্তি। এটাই কি ডিভাইড অ্যান্ড রুলের রাজনীতি না? দেহেরটা দেহকে দাও, মনেরটা মনকে। সিজারেরটা সিজারকে দাও, যিশুরটা যিশুকে। কিন্তু আজ যখন পুঁজি ও ঈশ্বর এক হয়ে গেছে, যারা দেহকে খাটায় বা কেনায়, তারাই মনকে মারে আর ভেল্কিতে মজায়। নিজেকে ফিরে পেতে হলে যৌনতাকে পণ্য করার পুঁজিবাদী খেলা আর নর–নারীকে অধিপতির সেবায়েত বানানোর সামন্তীয় আগ্রাসনের পার্থক্যটা ব্যবহারে, চরিত্রে না। ফতোয়া আর ফেমিনা দুটোই ভয়ংকর রেশমী ফাঁস। ফতোয়াবিরোধী হয়ে ব্লাউজের নিচে শাড়ি পরাকে প্রগতিশীলতা ঠাউরানো আত্মপ্রবঞ্চনা। নারীর পোশাক নারী ঠিক করবে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি সেখানে কমলা গাজর ঝোলায় কোন প্রাণীর তরে?
যৌনতা মানুষকে অমৃতের সন্তান করেছে, এরা সেই অমৃতকে কোকাকোলা বানিয়ে বিক্রি করবে আর খাব, এমন বেকুবি আর বেদিশার মধ্যে পড়েছি যারা, তাদের দেহমন উপনিবেশিত, তাদের সেলফ স্বাধীন না হলে যৌনতা স্বাধীন হয় কী করে? বুঝান!
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.