তানভীর আশিক
অনেক অনেক আগে ভূমধ্যসাগরের ক্রিট দ্বীপের রাজা ছিলেন মিনোস। মিনোসের রানী ছিল পসিফা। তাদের ছিল দুই কন্যা। আরিয়ানা ও ফেড্রা। আরিয়ানা ছিলো বড়।
রাজা মিনোসের আর এক সন্তান ছিলো। যার শরীরের অর্ধেকটা মানুষের আর অর্ধেকটা ষাঁড়ের। নাম মিনোটর। দৈত্যাকৃতির মিনোটর বাস করতো একটা গোলকধাঁধার ভেতর। আসলে মিনোটর ঠিক রাজা মিনোসের সন্তান ছিলো না। তবে রানী পসিফার গর্ভ থেকেই জন্মে ছিলো মিনোটর। মিনোটরের জন্মের ব্যাপারটা ছিলো এই রকম- সমুদ্র দেবতা পসাইডন মিনোসের কাছে উৎসর্গ করার জন্যে একটা শাদা ষাঁড় পাঠায়। মিনোস ষাঁড়টি নিতে অস্বীকার করে। এতে পসাইডন অপমানিত হয়ে মিনোসের স্ত্রী প‌সিফাকে ষাঁড়টির প্রতি আসক্ত করে তোলে। পসিফা শাদাষাঁড়টির সাথে মিলিত হয়। এই মিলনের ফলে জন্ম হয় মিনোটরের। মিনোটর ছিলো একটা মানুষখেকো দৈত্য।
গোলকধাঁধা
রাজা মিনোস মিনোটরের জন্য মানুষ নিয়ে আসতেন এথেন্স থেকে। মিনোস এথেন্স আক্রমন করে। মিনোসের ছিলো বিশাল নৌবাহিনী। সেই নৌবাহিনীর সাথে এথেন্সের রাজার সৈন্যরা পরাজিত হয়। মিনোস এই শর্তে এথেন্স ধ্বংস করেনি যে, প্রতি নয় বছর পর পর এথেন্স থেকে ৭ জন কিশোর আর ৭ জন কিশোরী ক্রিটো দ্বীপে পাঠাতে হবে। তাই হতো। প্রতি নয় বছর পর পর ৭ জন কিশোর আর ৭ জন কিশোরী ক্রিটো দ্বীপে পাঠিয়ে দিতো। তারা আর ফিরে আসতো না। কারণ এদেরকে ছেড়ে দেয়া হতো মিনোটরের গোলক ধাঁধায়। গোলক ধাঁধা থেকে ওরা আর বের হতে পারতো না। মিনোটর ওদেরকে তাড়া করে করে খেলতো আর ধরে ধরে খেয়ে ফেলতো।
একবার এথেন্স থেকে ৭ জন কিশোর আর ৭ জন কিশোরী ক্রিট দ্বীপে আসে। তাদের মাঝে একজন তরুণ ছিলো। নাম থেসিয়াস । রাজা মিনোসের বড় কন্যা আরিয়ানা প্রথম দেখাতেই থেসিয়াসের প্রেমে পড়ে যায়। সুন্দরী আরিয়ানা থেসিয়াসকে বাঁচাতে চাইলো। সে থেসিয়াসকে একটি তলোয়ার ও সুতার বান্ডিল দেয়। সুতার সাহায্যে সহজেই থেসিয়াস গোলকধাঁধা থেকে বের হবার পথ তৈরি করে নেয়। তার আগে তলোয়ার দিয়ে মিনোটরকে হত্যা করে। তারপর গোলকধাঁধা থেকে থেসিয়াস গোপনে বের হয়ে আসে। আরিয়ান তার ছোট বোন ফেড্রাকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলো সমুদ্রতীরে এক জাহাজ নিয়ে। থেসিয়াস আরিয়ানা ও ফেড্রাকে নিয়ে এথেন্সের দিকে রওয়ানা দেয়। জাহাজ চলতে থাকে এথেন্সের দিকে। থেসিয়াস আরিয়ানাকে নয়, ফেড্রাকে ভালোবেসে ফেলে। ফেড্রা ছিলো আরিয়ানার চেয়ে সুন্দরী। থেসিয়াস ও ফেড্রা যুক্তি করে নির্জন এক দ্বীপে আরিয়ানাকে রেখে এথেন্সে ফিরে যায়। থেসিয়াস ছিলো আসলে এথেন্সের রাজা। মিনোটর দৈত্যকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ক্রিটো দ্বীপে গিয়েছিলো। যাইহোক, ফিরে এসে রাজা ফেড্রাকে বিয়ে করে। তবে রাজা থেসিয়াস আগেই বিয়ে করেছিলেন একটা, সেই রানীর গর্ভে এক ছেলে ছিলো। নাম হিপ্পোলাইটাস। অসাধারণ রূপবান ছিলো সে। যেমন সুন্দর ছিলো তার চেহারা তেমনি পেশিবহুল শরীর।
শোকাহত ফেড্রা
ফেড্রা তার সৎপুত্র হিপ্পোলাইটাসের প্রেমে পড়ে গেলো। কিন্তু সে যে সম্পর্কে তার পুত্র! পুড়তে থাকলেন প্রেম বিরহে। কিভাবে হিপ্পোলাইটাসের সাথে মিলিত হওয়া যায় – এই চিন্তাই ঘুরতো ফেড্রার মাথায়। একবার রাজা থেসিয়াস কী কাজে যেন এথেন্স ছেড়ে বিদেশ গেলেন। ফেড্রা একা ঘরে। পাশেই হিপ্পোলাইটাস ব্যায়াম করছিলেন। ফেড্রা তার নগ্নশরীর দেখে আর থাকতে পারলেন না। প্রেম নিবেদন করলেন। কিন্তু হিপ্পোলাইটাস জানালো, পিতার স্ত্রীর সাথে অজাচারে সে লিপ্ত হবে না। ফেড্রা অনুনয় করে বলল, দেবতারাও তো অজাচার করে। করে না? হিপ্পোলাইটাস কোন কথা না বলে ফেড্রাকে প্রত্যাখান করে। ফেড্রা অপমানে রেগে যায়। রাজা থেসিয়াস এথেন্স ফিরে এলে স্বামীর কাছে মিথ্যা অভিযোগ করলো লম্পট হিপ্পোলাইটাস তাকে ধর্ষন করেছে। অভিযোগ শুনে রাজা ক্ষেপে গেলেন। তিনি হিপ্পোলাইটাসকে ধ্বংস হওয়ার অভিশাপ দিলেন। সমুদ্র দেবতা পসাইডন কর্তৃক থেসিয়াস বরপ্রাপ্ত ছিলো। তখন সমুদ্রের পাড় দিয়ে হিপ্পোলাইটাস রথে করে যাচ্ছিল। থেসিয়াস অভিশাপ দেয়ার সাথে সাথে সমুদ্র থেকে উঠে এল এক ভয়ালদর্শন সমুদ্রদৈত্য। দৈত্য দেখে রথের ঘোড়াগুলো ভয় পেল। ভয়ে ভীষণ বেগে ছুটতে থাকে। ফলে রথটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আর রথ থেকে পড়ে হিপ্পোলাইটাস মারা যায়।
হিপ্পোলাইটাস এর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ভীষণ অনুতপ্ত হয় ফেড্রা। সে তো হিপ্পোলাইটাসকে ভালোবাসতো। তারপর গভীর অপরাধবোধ আর গাঢ় বেদনায় কাতর হয়ে আত্মহত্যা করে সে।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.