তানভীর আশিক
বিশ্বামিত্র কঠিন তপস্যা শুরু করেছেন। দেবরাজ ইন্দ্র ভয় পেলেন কঠোর তপস্যা দিয়ে বিশ্বামিত্র না শেষে ইন্দ্রত্বপদ দখল করে নেয়। যেভাবেই হোক তার তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাতে হবে। শেষে বুদ্ধি বের করলেন, ডাকলেন অপ্সরাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী আকর্ষণীয়া মেনকাকে। সুন্দরী যৌবনবতী মেনকা এসে কুর্নিশ করে দাঁড়ালো ইন্দ্রের সামনে। ইন্দ্র মুগ্ধ নয়নে মেনকাকে দেখে চোখ সরু করে ঠোঁটের এক কোণায় হাসি ঝুলিয়ে মেনকাকে ছুঁড়ে দিলো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ, হে বরারোহে! তোমার এই রূপ-যৌবনের ধার কতোখানি তা আজ প্রমাণ হবে। পুস্করতীর্থবনে তপস্যা মগ্ন সূর্য্যসদৃশ তেজস্বী বিশ্বামিত্রকে যদি তুমি তোমার রূপ-যৌবন দিয়ে আকৃষ্ট করতে পারো, তবেই বুঝবো তুমি শ্রেষ্ঠা।
ইন্দ্রের কথা শুনে মেনকার গলা শুকিয়ে গেলো। ক্ষীণ স্বরে বললো, দেবরাজ! ভগবান বিশ্বামিত্র যেমন তপস্বী ও তেজস্বী, তেমনি ক্রুদ্ধস্বভাবের- এ তো আপনার অজানা নয়। এই মহর্ষি মহাভাগ বশিষ্ঠের প্রাণসম শত পুত্রকে হত্যা করেছেন, যিনি ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেও তপস্যা করে ব্রাহ্মণ হয়েছেন, যিনি অগাধসলিলা মহানদী কৌশিকীকে নিজের আশ্রমের পাশ দিয়ে প্রবাহিত করেছেন, যিনি ক্রুদ্ধ হয়ে অন্য এক নক্ষত্রলোক ও নক্ষত্রসমুদয় সৃষ্টি করিয়াছেন, হে মহান! যার এই রকম অলৌকিক শক্তি তার তপস্যায় আমি কী করে বিঘ্ন ঘটাবো? তবে আপনি যদি আমাকে বর প্রদান করেন যে, তাঁর ক্রোধাগ্নি আমাকে দগ্ধ করতে পারবে না; আর সমস্ত বিপদ হতে আমাকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন, তবে আমার যেতে কোন ভয় নেই।
ইন্দ্র মেনকাকে আশ্বস্ত করলেন, যাও, তাই হবে। মেনকা আবার তার কিন্নর কণ্ঠ তুললো, হে দেবরাজ! আমি যে সময়ে বিশ্বামিত্রের সামনে যাবো তখন বায়ু যেন আমার বস্ত্র উড়িয়ে নিয়ে যায় আর বন হতে সুগন্ধ বাতাস যেন প্রবাহিত হয়। ইন্দ্র হাসলেন, ‘তথাস্তু’ বলে মেনকার কথা মেনে নিলেন।
মহর্ষি বিশ্বামিত্রা কৌশিকী নদীর তীরে অশ্বথ ছায়ায় তপস্যা মগ্ন। মেনকা পায়ের মলে ছন্দ আর কণ্ঠে কিন্নর গীত তোলে বিশ্বামিত্রার পাশ দিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় কৌশিকী নদীর তীরে। যেন সে বিশ্বামিত্রকে দেখেই নি। যেন এই রূপসী তন্বী কেবল স্নান সারতেই এই নদীর তীরে এসে দাঁড়িয়েছে। গীত আর মলের শব্দে বিশ্বামিত্র চোখ খুলে তাকালেন। দেখলেন এক রূপসী ললনা নদী তীরে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপ্রস্থ কাপড়ে ঢাকা ললনার সোনালি শরীর আদিম ভাষায় সুর ছড়াচ্ছে। এই সময় কোথা থেকে সুগন্ধ নিয়ে এক উতলা বাতাস ললনার সেই এক প্রস্থ কাপড় উড়িয়ে নিয়ে ফেলে মহর্ষির পাশে। আর মহর্ষির সামনে উন্মোচিত হয় ললনার যৌবন। ললনা যখন তার কাপড় তুলতে যায় তখন চোখ পড়ে মহর্ষির চোখে। ললনা লজ্জায় লাল হয়ে দ্রুত কাপড়ে ঢেকে ফেলতে চায় নিজেকে। বাধা দিলেন মহর্ষি। কাপড়টা টেনে নিলেন নিজের কাছে। তপস্যা ভুলে যুবতীর রূপ-লাবণ্যে মগ্ন হলেন। এই তো চেয়েছিলো মেনকা। ধর্মকর্ম ফেলে বিশ্বামিত্র মেতে রইলেন মেনকাতে।
কিছুদিন পরই মেনকা গর্ভবতী হলো। জন্ম দিলো এক কন্যা সন্তানের। বিশ্বামিত্রেরও কামধ্যান ভাঙলো। বুঝতে পারলো তপস্যার ক্ষতি হয়ে গেছে। কন্যা ও মেনকাকে ফেলে চলে গেলো। মেনকাও তখন তার কন্যাকে মালিনী নদীরে তীরে ছুঁড়ে ফেলে চলে গেলো ইন্দ্রের সভায়।
নদী তীরে এমন ফুটফুটে এক কন্যা শিশুকে দেখে পাখিদের খুব মায়া হলো। হায়! হায়! কোন পাষণ্ড এমন সুন্দর ফুটফুটে এই বাচ্চাকে এভাবে ফেলে গেলো! তারা বনের জন্তু জানোয়ার থেকে বাচ্চাটিকে বাঁচাতে নিজেরাই ঢেকে রাখলো। তখন এই পথে যাচ্ছিলেন এক মুনি। নাম তার কন্ব। তিনি দেখলেন পাখিরা একটা শিশুকে ঘিরে রেখেছে। শিশুটিকে দেখে তাঁর মায়া হলো। তিনি কন্যাশিশুটিকে নিজের আশ্রমে নিয়ে গেলেন। কন্যাটি শুকন্ত অর্থাৎ পাখিদের দ্বারা রক্ষিত হয়েছিলো বলে তার নাম রাখলেন শকুন্তলা।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.