তানভীর আশিক
অনেক অনেক দিন আগে গ্রিসের ট্রাকিস নগরের রাজা ছিলো সিইকস। সিইকস ছিলো দেবতা ঊষাতারকার পুত্র। সিইকস ভালোবেসেছিলো এলসিয়নকে। এলসিয়নের পিতা এয়ুলাস ছিলেন বাতাসের দেবতা। এলসিয়নের হৃদয়েও কেবল সিইকসই ছিলো। তারা পরস্পরকে ভালোবাসতো। একদিন ধুমধামে বিয়ে হয়ে গেলো তাদের। তারা সখাসখি মিলেমিশে ভালোবেসে বেসে বেঁচে থাকতে থাকলো সুখে থেকে থেকে। তারা ঘুরে বেড়ায় বিকেলের মাঠ, সমুদ্রতীর সন্ধ্যার বাতাসে চুল উড়িয়ে। তারা ভালোবাসে সমুদ্রতটে চন্দ্রিলা রাত প্রেম প্রেম খেলে। যেহেতু তারা সুখে ছিলো, যেহেতু তারা পরস্পরকে ভালোবেসে সুখে ছিলো, তাই তারা ভাবলো একে অপরকে ভিন্ন নামে ডাকবে। চন্দ্রিলা রাতে চাঁদের আলো যখন তাদের প্রেম প্রেম খেলায় কিছুটা আড়াল দিতে মুখ ঢাকলো মেঘের চাদরে। তখন ঠোঁট কাঁপা স্বরে এলসিয়ন সিইকসের কানে মধু ঢেলে বললো, প্রাণ আমার, প্রিয় স্বামী, তুমি আমার জিউস, আমার প্রাণ দেবতা। এলসিয়নের কাঁপা ঠোঁট থেকে ঠোঁট তোলে তার চুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণে মোহিত হয়ে ভেজা অথচ গাঢ় কণ্ঠে সিইকস জানালো, এলসিয়ন, জান আমার, তুমি আমার রাণী, প্রেয়সী হেরা।
সিইকস ও এলসিয়নের নির্দোষ এই প্রেমের সম্বোধন মেনে নিতে পারলো না দেবরাজ জিউস আর দেবরানী হেরা। তারা ভাবলো, সিইকস ও এলসিয়ন তাদের বিদ্রুপ করেছে। ফলে জিউস তাদের উচিত শিক্ষা দেবে এমন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। আর সুযোগ খুঁজতে থাকে কীভাবে এদের শায়েস্তা করা যায়।
একদিন হঠাৎ করে অজানা কারণে সিইকসের ভাই মারা গেলো। এক দৈববাণী জানিয়ে গেলো অশুভ বার্তা। ভাই হারিয়ে শোকার্ত সিইকস সিদ্ধান্ত নিলো সমুদ্র পেরিয়ে ওরাকলকে জিজ্ঞেস করবে, কেন এমন হচ্ছে? কী করলে দূর হবে অশুভ সময়? ভেবে উত্তাল সমুদ্রে নৌকা ভাসালো। এলসিয়ন বাধা দিলো, দরকার নেই যাওয়ার। কিন্তু সিইকস শুনলো না। তখন এলসিয়ন সিইকসের নৌকায় চড়ে বসলো, ‘আমি যাবো তোমার সাথে। তুমি আমার আত্মা, আমার প্রাণ। তোমার সাথে সাথেই সারাজীবন থাকবো এই আমার পণ।’ সিইকস বোঝালো তাকে, ‘তুমি চিন্তা করো না। আমি যাবো আর আসবো। ঠিক ঠিক সন্ধ্যার আগেই আমি ফিরে আসবো।’ এলসিয়ন কান্না ভেজা চোখে সিইকসকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় চুম্বনে বিদায় জানালো, তুমি সাবধানে যেও, না ফেরা পর্যন্ত আমি সৈকতেই থাকবো, তোমার অপেক্ষায়।’ সিইকস তার নৌকা ভাসালো।
জিউস সুযোগ পেয়ে গেলো। এবার জিউস আর হেরা সাজার উপযুক্ত সাজাই দেয়া হবে ওদের। জিউস প্রচণ্ড ঝড় তোললেন সমুদ্রে, তারপর বজ্র দিয়ে পুড়িয়ে দিলেন তার নৌকা। সমুদ্রজলে ডুবে মারা গেলো সিইকস।
এলসিয়ন সৈকতেই দাঁড়িয়েছিলো। যতদূর চোখ যায়, তাকিয়ে ছিলো সে। না, দেখা যায় না সিইকসের নৌকা। 'এখনো আসছে না কেন?' ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো সমুদ্র তীরে। সূর্য ডুবে গেলো। কী কারণে যেন চাঁদটাও আজ ওঠেনি। সে বসলো বালিতে। ভয় হচ্ছে তার খুব। কিছু হয়নি তো সিইকসের! বসে বসে জপতে থাকলো হেরার নাম: ‘হে দেবরানী! আমার স্বামীকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও তোমার স্বামী দেবরাজ জিউসের দোহাই।’ মন গললো হেরার। মায়া হলো খুব। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে।
সমুদ্রতটে বসে থেকে হেরার নাম জপতে জপতে এলসিয়ান হঠাৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন হলো। আর তখন হেরা স্বপ্নের দেবতা মরফিয়াসকে পাঠালো এলসিয়ানের তন্দ্রার ভেতর। জানানো হলো স্বপ্নদৃশ্যের মাধ্যমে সিইকসের মৃত্যু খবর। কাঁদতে কাঁদতে তন্দ্রা ভাঙলো এলসিয়নের। ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। শান্ত সমুদ্র। এলসিয়ন সমুদ্র্রের দিকে তাকিয়ে দেখে নীল সমুদ্র থির পড়ে আছে। কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। সে হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করলো সকল দেবতার কাছে কেঁদে কেঁদে, “আমার এ জীবন সিইকস ছাড়া অর্থহীন। আমাকে দু’টি পাখা দাও। আমি সারা সমুদ্র তন্ন তন্ন করে খুঁজবো আমার স্বামীকে। আমি একবার তার মুখ দেখতে চাই।” দেবতাদের চোখ ভিজে গেলো স্বামীর প্রতি এলসিয়ানের ভালোবাসা দেখে। কিন্তু তখন তো আর কিছু করার নেই। দেবরাজ জিউস সিইকসকে মেরে তলিয়ে দিয়েছে সমুদ্রতলে। তারপরও এলসিয়নকে দেবতারা দু’টি পাখা দিয়ে বানিয়ে দিলো সামুদ্রিক চিল। চিল রূপী এলসিয়ন সারা সমুদ্র উড়ে উড়ে খুঁজে সিইকসকে। তার কান্না সমুদ্রের বাতাসে মিশে হাহাকার তোলে। সমুদ্রে না পেয়ে কখনো কখনো সে স্থলেও খুঁজে, যদি একটি বার দেখতে পায় তার প্রিয়তমের মুখ!
সেই থেকে চিলেরা আকাশে উড়ে উড়ে নিচের দিকে তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজে। অনেক অনেক দিন পর সেটা কেবল বুঝতে পারেন বাংলার এক কবি। তাঁর নাম জীবনানন্দ দাশ। তিনি চিলকে উদ্দেশ্য করে সান্ত্বনা দিয়ে লিখেন,
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো ? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.