তানভীর আশিক
বছরের প্রথম দিন। রাজ্য জুড়ে উৎসব। উৎসব রাজ প্রাসাদেও। প্রিয়ভাজনদের নিয়ে জলসা ঘরে বসেছেন সম্রাট আকবর। ঘর জুড়ে লোবানের ঘ্রাণ। কিছুক্ষণ আগেই শেষ করে শাহীখানা, ফরাসী শরাবে সবাই একটু ঘোরগ্রস্ত। হঠাৎ আকবর আসন ছেড়ে দাঁড়ালেন, সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলো সকলেই। আকবর নাটকীয় ভঙ্গিতে জানালেন, আজ এই খুশির দিনে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো এক রক্ত গোলাপের সাথে। যার রূপ পাকা আনারের দানার মতো রক্তিম আর টসটসে। আর যৌবন রক্তজবার কলির মতো। আমি ভালোবেসে তার নাম দিয়েছি আনারকলি। তুরস্কের রাজা আমার জন্য এই উপহার পাঠিয়েছেন। সবাই মৃদু করতালির মাধ্যমে খুশি প্রকাশ করলো। জলসা ঘরের মঞ্চে ছড়িয়ে পড়লো চন্দনকাঠের ধোঁয়া।
আনারকলি
আর আলোছায়ার মঞ্চে নূপুরের নিক্কনে এসে দাঁড়ালো ঘোমটা টানা এক তন্বী। আলো পড়লো। দেখা গেলো আলতা রাঙা দুটি পা, ইরানি কারুকাজের পোশাক পরা তন্বী সুর তুললো কণ্ঠে। এতো মিহি আর সুরেলা সে কণ্ঠ শ্রবণে তন্ময় হয়ে রইলো সকলে। মুগ্ধতার আরো বাকি ছিলো- নাচের এক পর্যায়ে যখন ঘোমটা টানা ওড়না বাতাসে ছুঁড়ে দিলো। আর সে ওড়না উড়ে গিয়ে পড়লো শাহজাদা সেলিমের কাছে। সেলিম তাকিয়ে দেখলো মঞ্চের এ তন্বী মর্তের কোন রমনী নয়। সে অন্য কোন গ্রহ থেকে আসা রূপসী। এতো রূপ কোন মানবী অঙ্গে থাকতে পারে সেলিম তা আগে কখনো দেখে নি। আর তার ওড়না থেকে যে ঘ্রাণ আসছে তাতে মোহগ্রস্ত হয়ে গেলো শাহজাদা সেলিম। মুগ্ধ হয়ে দেখলো তার নাচ, শুনলো গান।
সেলিম প্রেমে পড়ে গেলো আনারকলির। কিন্তু আনারকলি তার পিতার রক্ষিতা। হেরেমে আনারকলির ঘরে যাওয়ার অধিকার সম্রাটের ছাড়া আর কারো নেই। কিন্তু আনারকলিকে না পেলে চলবে না শাহজাদার। যে রূপ তার সে দেখেছে! আনারকলিকে তার চাই-ই চাই। হেরেমের রক্ষীকে ঘুষ দিয়ে সেলিম ঢুকে গেলো আনারকলির ঘরে। যা হওয়ার তাই হলো। আনারকলিরও ভালো লেগে গেলো শাহাজাদা সেলিমকে। গোপনে গোপনে চলতে থাকলো তাদের প্রেম।
আনারকলির বয়স তখন চল্লিশের কাছাকছি আর সেলিমের ত্রিশ। তাতে কি! প্রেম ভালোবাসাতো আর বয়সের ধার ধারে না। ধার ধারে না স্থান, কাল, পাত্রের। যদি ধারতো তবে শাহাজাদা হয়ে হেরেমের নর্তকীর প্রেমে পড়তো না সেলিম। যাইহোক, সেলিমের ঘন ঘন হেরেমে যাওয়াটা চোখে পড়লো সম্রাটের। বন্ধ হয়ে গেলো সেলিমের হেরেমে যাওয়া। কিন্তু যে গভীর প্রেমে মজে আছে সেলিম আর আনারকলি তাতে দূরত্ব মানা কঠিন, মানা কঠিন বাধা-বিপত্তি। রাতের আঁধারে গোপনে তারা দেখা করবে নদীর তীরে ভাঙ্গা মন্দিরের ওখানে। এমনটাই চিঠিতে জানালো শাহাজাদা আনারকলিকে। আনারকলি চিঠি পড়ে অপেক্ষায় থাকলো রাত্রি নামার। রাতে আঁধার ঘন হলে হেরেমের রক্ষীর সহায়তায় আনারকলি বের হয়ে গেলো হেরেম থেকে।
আনারকলি ও সেলিম
তারপর ধীরে চলে গেলো পূর্ব নির্ধারিত স্থানে। মিলিত হলো প্রেমিক শাহাজাদা সেলিমের সাথে। কিন্তু, সম্রাট আকবর বলে কথা, আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলো সব। সম্রাটের সেনাদের হাতে ধরা পড়ে গেলো সেলিম-আনারকলি। ঠাণ্ডা মাথার আকবর দেখালো তার নৃশংসতা। নর্তকী হয়ে শাহাজাদার সাথে প্রেম করার অপরাধে সেলিমের সামনেই আনারকলিকে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়। মৃত্যু হয় একটি রক্তগোলাপের আর সমাপ্ত হয় একটি প্রেমকাহিনীর।
ইতিহাসে আনারকলিকে নিয়ে অনেক মত, অনেক গল্প। কেউ বলে আনার কলির প্রকৃত নাম নাদিরা বেগম, কেউ বলে শার্ফ-উন-নেসা। নাম যাই হোক না কেন, আনারকলি হচ্ছে আনারকলি। পরবর্তীতে সেলিম আনারকলির স্মৃতির উদ্দেশ্যে এক সমাধি সৌধ নির্মান করেন লাহোরে। আজো আছে সেটা। সৌধটি অষ্টভুজাকৃতি। আছে আটটি গম্বুজ। গম্বুজগুলো নির্মিত স্তম্ভের ওপর। একটি স্তম্ভে লেখা আছে আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম আর দুই লাইনের একটি ফারসি কবিতা:
তা কিয়ামাত শুকর গুইয়াম কারদিগারি কিশ রা
আহ, গার মান বাজ বিনাম রু ইয়ার-ই-খুশ রা
"একবার, আর একবার দেখতে পাই প্রিয়তমার মুখ যদি
ঈশ্বর, তোমার নাম ডেকে যাবে হৃদয় কেয়ামত অবধি"

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.