রাজিউল হাসান, সাময়িকী.কম

অবিলম্বে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন থামাতে হবে, না হলে রুশ-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি ঘটবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। [ছবি: ফাইল ছবি]
শুক্রবার এক দীর্ঘ ফোনালাপে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে এই হুঁশিয়ারি দেন।
ক্রেমলিন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট পুতিন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন, গাজায় নিরস্ত্র নিরপরাধ সাধারণ মানুষের উপর ইসরায়েলি বোমা বর্ষণ অবিলম্বে থামাতে হবে নতুবা রাশিয়া ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।
তিনি আরো বলেন, বিশ্ব শান্তিতে যদি ইসরায়েল ব্যাঘাত ঘটায় তবে রাশিয়া তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
এদিকে হামাস লুকিয়ে আছে সন্দেহে শনিবার ইসরায়েলি বিমান গাজায় একটি মসজীদে হামলা চালিয়েছে। এনিয়ে মৃতের সংখ্যা ১শ ২০ ছাড়াল।
ইসরায়েল ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামে এই তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করে পাঁচদিন আগে। সেসময় তারা বলেছিল, ইসরায়েলি জনসাধারণের ওপর রকেট হামলা রুখতেই এই অভিযান। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূখপাত্র আশরাফ আল-কিদরা বলেন, দিনরাত অনবরত এই হামলায় নিহতের সংখ্যা ১২০ ছাড়াল। এছাড়া গুরুতর আহত ও নিখোঁজ হয়েছে ৯শ’ ২০ এর ওপরে।
নিহত সন্তানকে নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মিছিল
এদিকে ইসরায়েল সেনাবাহিনী আক্রান্ত মসজীদটিসহ এর আশেপাশের এলাকার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে বলেছে, এখান থেকে অন্য ধর্মাবলম্বী এবং সাধারণ মানুষের ওপর রকেট ছোঁড়ার পরিকল্পনা চলছিল। তারা জানায়- হামাস, ইসলামিক জেহাদ ও অন্যান্য গাজা’র জঙ্গীরা অন্যধর্মের লোকজন এবং নিজেদের সাধারণ মানুষদের ওপর এধরণের হামরা চালিয়ে এরা মূলত আবারো সবার হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়াসহ ‘আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল’ নেটওয়ার্ক পূণরজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে।
ইসরায়েল সেনাবাহিনীর মূখপাত্র ল্যাফটেনেন্ট কর্ণেল পিটার লার্নার বলেন, হামাস সন্ত্রাসীরা আসলে এখন নিজেদের মানুষের ওপর হামলা করার পরিকল্পনা করছে, গাজায় ফিলিস্তিনি জনসাধারণকে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে নিজেদের লুকিয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার বুদ্ধি এঁটেছে।
ইসরায়েলি হামলায় নিহত শিশু
জেরুজালেম পোস্ট তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শনিবার ইসরায়েল বাহিনী অন্তত ৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। সেনাবহিনী জানিয়েছে, অভিযান শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৬শ’ স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে।
ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ইসরায়েল এখনই এই অভিযান বন্ধ করতে পারবে না। যত বড় আন্তর্জাতিক চাপই আসুক না কেন, এই অভিযান বন্ধ হবে না।
নেতানিয়াহু বলেন, গাজায় আমরা হামাস ও ইসলামিক জেহাদের ১ হাজারের বেশি আস্তানায় আঘাত হেনেছি। ইসরায়েলি জনসাধারণ নিজেকে নিরাপদ মনে না করা পর্যন্ত আমরা এই হামলা অব্যাহত রাখবো।
গাজা থেকে রকেট হামলা
এদিকে শুক্রবার ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে লেবানন থেকে এক রকেট হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলার কারণে এখন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এই সংঘাতে লেবাননের জঙ্গীরাও হামাসের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে।
লেবানিজ সেনাবাহিনী এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী পরবর্তীতে লেবাননে এই হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা সংগঠনকে খোঁজা শুরু করেছে।
দক্ষিণ লেবাননকে ‘হযিবুল্লাহ’র শক্ত ঘাঁটি বলে গণ্য করা হয়। হিযবুল্লাহ এর আগে বেশ কয়েকবার ইসরায়েলের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তবে এবারের হামলায় হিযবুল্লাহকে দায়ী করা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে- এ হামলা চালিয়েছে হামাসেরই সমমনা কোনো ছোট সংগঠন।
গাজায় এক ভবনে ইসরায়েলি হামলার পর
জেরুজালেম পোস্ট তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, ইরায়েলের সেনাবহিনীও মনে করছে এ হামলার ঘটনা হিযবুল্লাহ ঘটায়নি। ঘটিয়েছে লেবাননের কোনো ছোট সংগঠন, যা হামাস কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত।
এদিকে গাজা থেকে এখন পর্যন্ত ৭শ’র মতো রকেট এবং মর্টার হামলা চালানো হয়েছে ইসরায়েলে। মার্কিন অর্থায়নে ইসরায়েলের তৈরিকৃত ‘আয়রন ডোম’ রকেট প্রতিরক্ষা সিস্টেম ১শ ৩০ এর বেশি রকেট আকাশপথে ধ্বংস করেছে।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি এই ক’দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ইউরোপিয় ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সাথে কথা বলেছেন। কোনো বহিরাগত চাপই ইসরায়েলকে রুখতে পারবে না বলেও এসময় তিনি হুমকি দেন।
নিহত এক ফিলিস্তিনকে নিয়ে রাস্তায় সাধারণ মানুষ
এদিকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন গণমাধ্যম সচিব জোস আর্নেস্ট সাংবাদিকদের বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নেতানিয়াহুর সাথে গাজা সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সন্ত্রাসী হিংস্রতােএকমত পোষণ করেছেন।
আর্নেস্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে রকেট হামলা বন্ধে একমত এবং দেড় বছর আগে সন্ত্রাস দমনে আমরা যে পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, একই পদক্ষেপ এবারও নিতে আগ্রহী।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে আটদিনের এক বড় সংঘাতে গাজা থেকে ইসরায়েলকে উদ্দেশ্য করে রকেট হামলা বন্ধ হয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ২ জুলাই মধ্যরাতে জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি কিশোর মোহাম্মেদ আবু খেদাইরকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল, ৩০ জুন ইসরায়েলি তিন কিশোরকে হত্যার প্রতিশোধ ছিল এটি। তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে হত্যার সঠিক বিচার করার কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু সুষ্ঠু বিচারের নামে পরবর্তীতে দেখা যায়, গণহারে ফিলিস্তিনিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং প্রমাণের চেষ্টা চলছিল, এই হত্যার জন্য দায়ী হামাস।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের পর জেরুজালেমে বসবাসরত ফিলিস্তিনি অধিবাসী এবং ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে হঠাৎ করেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ৪ জুলাই আবু খেদাইরের দাফনের পর সংঘাত আরো বেড়ে যায়। এদিকে আবু খেদাইরের হত্যার প্র্রায় সমসাময়িক সময়ে তার চাচাত ভাই ফ্লোরিডা থেকে বেড়াতে আসা তারিক খেদাইরের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর পোশাকধারী দুই অজ্ঞাত পরিচয় তাকে প্রথমে অপহরণ করার চেষ্টা করে এবং পরে রাস্তায় ফেলে মারধর করে। এ ঘটনার দৃশ্য গোপেনে ক্যামেরায় ধারণ করে পরবর্তীতে সেই ভিডিও খেদাইর পরিবার ও স্থানীয় গলমাধ্যমকে দেয় এক প্রতিবেশী। অপরদিকে আবু খেদাইরের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা যায়, তাকে প্রথমে মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয় এবং পরে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। পোস্টমর্টেমে আবু খেদাইরের ফুসফুসে ধোঁয়া পাওয়া যায়। এ থেকে প্রমাণিত হয়, দগ্ধ হওয়ার সময়ও আবু খেদাইর শ্বাস নিচ্ছিল।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং শহরে ইসরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে জেগে উঠছে মানুষ
এসব ঘটনার সাথে সাথে ফিলিস্তিনিদের মাঝে বিদ্রোহ ফুঁসে ওঠে। হামাস গাজা থেকে ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায়। এরই জবাবে ‘অপারেশন প্রোটেক্টিভ এজ’ নামে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের এ হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন জানালেও তুরস্ক, মিশর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তুরস্ক সরকার ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক ছেদেরও হুমকি দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও শুক্রবার এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য পশ্চিম জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়।
এদিকে এই হামলার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এ হামলা বন্ধে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানববন্ধন ও মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। এডেনবার্গ, মেলবোর্নসহ বেশ কিছু শহরে ইসরায়েলের এ হামলার নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলকে বয়কট করারও আহ্বান জানিয়েছে সাধারণ মানুষ।
তথ্যসূত্র: ফক্স নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, বিবিসি, আল জাজিরা


Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.