মঈন মুরসালিন

এক দরবেশ, এক পণ্ডিত ও এক বাউল এই তিনজনের সম্পর্ক খুবই গভীর। আর এই তিনজনেই খুব অলস, বাউণ্ডুলে। গ্রীস্মের এক সকালে তারা সিদ্ধান্ত  নিলো কোন কাজ না করেই তারা ঘুরে ফিরে অন্যের কাজ থেকে চেয়ে চেয়ে তাদের জীবন চালাবে। সত্যি সত্যি তারা বাউণ্ডুলের মতো জীবন যাপন করতে লাগলো এবং তা তাদের অভ্যাসে পরিণত হলো।
একদিন ঘুরতে ঘুরতে শহরের বাইরে একটি ফলের বাগানে উপস্থিত হল। বাগানের মালিক সেখানে ছিলো না। কারো অনুমতি ছাড়াই বাগানে প্রবেশ করে গাছ থেকে ফল ছিঁড়ে খেতে লাগলো। দুপুরে বাগানের মালিক এসে দেখে তিনজন অপরিচিত লোক তার বাগানের ফলমূল সাবাড় করছে! বাগানের মালিক শীতকালে প্রচণ্ড কষ্ট করে বাগানের পরিচর্যা করেছিলো। এখন তার ফসল তোলার মৌসুম। এই অবস্থা দেখে রাগে তার মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। অনেক কষ্টে মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করলো যে, তিনজনের সাথে সে একা লড়াইয়ে পারবে না। তাই কৌশলে এদের শাস্তি দিতে হবে।
মালিক বাগান থেকে কিছু আঙুরের গুচ্ছ নিয়ে তাদের নিকট গেলো এবং বললো, আসসালামু আলাইকুম! আমার বাগানে আপনাদেরকে স্বাগতম। তারা তিনজন অবাক হয়ে গেলো। একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো। বাগানের মালিকের এ ব্যবহারে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছিলো না তারা।
মালিক কাছে এসে বলতে লাগলো, কী আশ্চর্য! সকাল থেকে একা একা আছি! আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করছি, তিনি আপনাদেরকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু এ কী! আপনারা মাটিতে বসে আছেন! অতিথির অসম্মান করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন! কথার ফাঁকে মালিক বুঝতে পারলো এদের মধ্যে দরবেশের মতো দেখতে লোকটি সবচেয়ে গবেট। তাকে বললো, আমি একটু ক্লান্ত, যদি কিছু মনে না করেন, বাগানের ঐ পাশে যে ঘরটি দেখতে পাচ্ছেন সেখানে গালিচা রাখা আছে। অনুগ্রহ করে সেটি এখানে নিয়ে আসেন। সবাই আরাম করে এখানে বসতে পারবো।
দরবেশ গালিচা আনতে ঘরের উদ্দেশে রওয়ানা হলো। মালিক অন্য দুজনের দিকে মুখ কাছে নিয়ে বললো, আপনাদের দুজনের প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা আছে। আপনাদের একজন পণ্ডিত, আর একজন বাউল। আপনাদের পদধূলি আমার সারা জীবনের সম্মান। কিন্তু এই দরবেশকে আমি মেনে নিতে পারছি না। অলস বাউণ্ডুলে! সে যদি না থাকত, তা হলে এক সপ্তাহ এখানে আরামে থাকতে পারেন আপনারা। আপনাদের আপ্যায়নে আমার কোন অসুবিধা হবে না।
মালিকের কৌশল কাজে লাগলো। তারা বললো, আপনি ঠিক বলছেন আমরা নিজেরাও তাকে খুব পছন্দ করি না। সে জোর করে আমাদের সাথে লেগে আছে। আপনি এ ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নিন।
দরবেশ গালিচা নিয়ে এলে মালিক তাকে বলল, দেখো, পণ্ডিত আর বাউলকে আমি দীর্ঘদিন যাবত চিনি। তারা আমার মেহমান। অলস সূফী দরবেশদেরকে আমি একেবারে সহ্য করতে পারি না। অতএব, তুমি তোমার পথ দেখো।
দরবেশ অন্য দুজনের দিকে তাকালো। তারা মাথা নিচু করে নীরবে বসে ছিলো। দরবেশ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বললো, ‘ঠিক আছে আমার বন্ধুরা, আমি চললাম। কিন্তু মনে রেখো এই লোক তোমাদেরকেও ঠিক এমনিভাবে অপমানিত করবে।’
পণ্ডিত ও বাউল জবাব দিলো, এ বিষয়ে তোমার চিন্তা করার দরকার নেই।
দরবেশ বাগানের বাইরে চলে গেলো। মালিক তার পেছনে পেছনে গেলো। হাতে একটা লাঠি নিয়ে নিলো। বাগানের বাইরে দরবেশকে একা পেয়ে লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগলো এবং বললো, দুষ্ট দরবেশ! অনুমতি ছাড়া মানুষের বাগানে ঢুকে ফল খাও, কাজ করে খেতে পারো না?
এরপর মালিক অপর দুজনের নিকট চলে গেলো এবং বললো, ক্ষমা করবেন! হাত তুলতে চাইনি। কিন্তু মুখে মুখে তর্ক করছিলো, তাই একটু শাস্তি দিলাম। ও আচ্ছা, দুপুর তো হয়ে গেলো। খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা দরকার...।
দুজনই বলল, ‘না ভাই, আমরা যথেষ্ট ফল খেয়েছি! খাবার প্রয়োজন নেই। আপনি কষ্ট করবেন না!
‘অসম্ভব, আপনাদের এ কথা রাখতে পারবো না! তেমন কিছু না; একটুকরা রুটি-পনির মিলেমিশে খাবো।” অতএব সে বাউলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘জনাব বাউল সাহেব! আপনার পূর্বপুরুষের জন্য আমার জীবন উৎসর্গ হোক। আমার বাড়ি নিকটেই কিন্তু সেখানে আমি গেলে বাচ্চাদের হাত থেকে নিস্তার পাই না। আপনি একটু কষ্ট করে আমার বাড়িতে যান। বলবেন; বাগানের মালিক পাঠিয়েছে, তার সাথে দুজন মেহমান আছে। তিনজনের খাবার যেন দিয়ে দেন। বাড়িটি খুব বেশি দূরে নয়। ঐ যে বাম হাতের দ্বিতীয় গলিতে ডান দিকের চতুর্থ বাড়ি।’ বাগানের বাড়ির মালিক জানতো যে, সে বাড়িতে কেউ থাকে না।
বাউল খাবারের সন্ধানে পা বাড়াল। তখন মালিক পণ্ডিতের নিকট গিয়ে বসল এবং বলল, ‘প্রিয় বন্ধু, একজন জ্ঞানী লোকের সাথে কয়েক দিন অতিবাহিত করাটা আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি একজন পরিশ্রমী বাগান মালিক। বাগানের পরিচর্যা করি। আপনি একজন ধর্মীয় পণ্ডিত, ধর্মীয় বিষয়ে আমাদেরকে জ্ঞান দেন। আমাদের উপর আপনার দাবী আছে। কিন্তু ঐ লোক যে নিজেকে বাউল বলছে, ‘কাঁধের উপর ঐ ঝোলা ছাড়া তার তো আর কোন সনদ দেখতে পাচ্ছি না। সে যদি না থাকে তো তবে আপনাকে পুরো গ্রীষ্মের অতিথি করে রাখা আমার জন্য কোন সমস্যাই না। আপনার কাছ থেকে আমরা কিছু জ্ঞান অর্জন করতে পারবো। আমন্ত্রণের লোভে ফেঁসে গেলো পণ্ডিত। সে বললো,‘আপনি ঠিক কথাই বলেছেন, কিন্তু...! মালিক বলে উঠলো, আপনি ভাববেন না, সব ব্যবস্থা আমিই করবো।
বাউল গ্রাম থেকে খালি হাতে ফিরে এলো এবং বলল যে, সেখানে কেউ নেই। মালিক বলল, ‘ঠিক আছে, যখন কেউ নেই তো নেই। এখন আসল কথা বলি। এই পণ্ডিত আর আমার মধ্যে পুরনো বন্ধুত্ব আছে। আমি তার সাথে কিছুদিন একান্তভাবে থাকতে চাই। তাই তুমি চলে গেলে আমি খুশি হবো।
বাউল পণ্ডিতের দিকে তাকাল এবং বিষয়টা বুঝতে পেরে বলল,  আচ্ছা, আমিও চলি, কিন্তু কাজটা ঠিক হলো না। আমরা ভ্রমণসঙ্গী ছিলাম। এখন আমি একা আর তুমি আনন্দে থাকো...।’
পণ্ডিত বলল, আমি কি করতে পারি? বাগান তো আর আমার সম্পত্তি নয়।
বাউল বললো, আমার সন্দেহ হচ্ছে, লোকটি তোমার বিশেষ ক্ষতি করবে! সাবধানে থেকো। খোদা হাফেজ।
বাউল বাগান থেকে বেরিয়ে গেলো, মালিকও তার পশ্চাতে চলে গেলো এবং পেছন থেকে ঘাড় ধরে তার পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল, দুষ্ট কোথাকার, অনুমতি ছাড়া মানুষের বাগানবাড়িতে ঢুকিস! খাও দাও ফুর্তি করিস! বাউল কোন মতে নিজেকে তার হাত থেকে রক্ষা করে পালাল।
এবার মালিক বাগানে ফিরলো। বাগানের দরজা ভাল করে বন্ধ করে হাতে লাঠি নিয়ে পণ্ডিতের নিকট গেলো এবং বললো, এবার তুমি তোমার কথা বলো।
পণ্ডিত বললো, আমার আবার কি কথা?
মালিক বললো, আমাকে বলো যে কোন ধর্মীয় কিতাবে-এ কথা লেখা আছে যে মানুষের বাগানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যায়! তাড়াতাড়ি জবাব দাও, নইলে এই লাঠি দিয়ে তোমার খবর নিচ্ছি!
পণ্ডিত ভয়ে কাতর হয়ে বললো, না, কোন কিতাবে-এ এ রকম লেখা নেই। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, কিছুক্ষণ আগেও তুমি আমার সাথে চমৎকার আচরণ করেছো; এখন এ রকম ব্যবহার করছ কেন?
মালিক বলল, এর আগে তোমরা তিনজন ছিলে আর আমি ছিলাম একা। তোমরা অনুমতি ছাড়া আমার কষ্টের বাগানের ফল ছিঁড়ে খেয়েছো! বাগান নষ্ট করেছো! তাই এখন এই লাঠি দিয়ে সেই হিসেব উসুল করতে আমার হাত নিশপিশ করছে।
পণ্ডিত বলল, তোমার হিসেব ঠিকই আছে। আসলে আমরা তিনজনই ভণ্ড। ভণ্ডামি করে ঘুরে অন্যের অন্ন খাওয়াই আমাদের অভ্যাস, আমরা অপরাধী, শাস্তি আমাদের জন্য অপরিহার্য। মালিক এবার তাকেও লাঠি পেটা করে বাগান থেকে তাড়িয়ে দিলো। মালিকের উপস্থিত কৌশলে তিন বাউণ্ডুলেকে জীবনের মতো শিক্ষা দিয়ে দিলো। 

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.