হাসান মাসুদ, সাময়িকী.কম
Israel
২০০২ সালে নাবলুসের নাজাহ ইউনিভার্সিটির এক সমীক্ষায় ৮৭.৫% ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলসহ ফিলিস্তিনের সমগ্রভূখণ্ড জয় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত প্রসঙ্গে বাংলাদেশীরা, অন্তত বাংলাদেশীদের আলাপচারিতা পর্যবেক্ষণ করলে যে কেউ সহজেই অবুধাবন করতে পারবেন যে, বাংলাদেশীদের মত বিবেকবান, ন্যায় পরায়ন, সাম্যবাদী, করুণা ও দয়াশীল, এবং সৎ মানুষ দুনিয়াতে দ্বিতীয়টি নেই। আর দুনিয়ার যতোসব বিবেকহীন, দুর্বৃত্ত, অত্যাচারী, শোষণকারী, আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী মানুষের আড্ডাখানা হচ্ছে আমেরিকা ও বৃহত্তর পাশ্চাত্য এবং ইসরায়েল। এ ব্যাপারে ব্যাপক তথ্যানুসন্ধানের পর আমার চিন্তা-ভাবনার কিছুটা পরিবর্তন হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বিষয়ে মতামত প্রকাশ করতেই সবচেয়ে বেশী সংকোচ বোধ করি। মূলধারার সাথে তাল মেলাতে না পারলে আপনাকে হতে হবে বিবেকহীন, অত্যাচারী, শোষণকারী, আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদীর দোসর। কে চায় এমন ঘৃণ্য পরিচয় বরণ করতে?

যাহোক, ফিলিস্তিনের গাজা অঞ্চলে আবার নতুন করে সহিংসতার কারণে স্বভাবতঃই বাংলাদেশীদের মাঝেও আলোচনার ঝড় উঠেছে। এবং প্রত্যাশা অনুসারে ইসরায়েলকে বিবেকহীন, অত্যাচারী, গণহত্যাকারী, আগ্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী ইত্যাদি বলে রীতিমতো দোষারোপ ও গালিগালাজ করা হচ্ছে। এবং 'ইসরাইলের দোসর' চিহ্নিত হওয়ার সমূহ ঝুঁকি সত্ত্বেও দু’কথা বলার জন্য এই লেখা।

ফিলিস্তিনিদের বড় শত্রুঃ বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব  বামপন্থীরা
এ প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রবেশের আগে বলা প্রয়োজন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান কেবল পাশাপাশি দু’টো স্বাধীন ও নিরাপদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাঝেই নিহিত। আজ কোন সুস্থ মনের মানুষই বিশ্বাস করে না যে, ফিলিস্তিনিদের ৬৪-বছর-ধরে-চালানো ইসরায়েলকে ধ্বংসের প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব কিংবা তা ঠিক হবে। আজ হামাস, হেজবুল্লাহ, ইরান, সিরিয়া ও অধিকাংশ ফিলিস্তিনিদের (৮৭.৫ শতাংশ) প্রত্যাশা অনুসারে ইসরাইলের ধ্বংস যদি সম্ভবও হয় – ইহুদিদেরকে গণহত্যার কিংবা পাশ্চাত্যে প্রেরণের মাধ্যমে – তা হবে সুস্থ চিন্তার মানুষের জন্য চরম নৈতিক পরাজয়। সেখানে প্রধান ভূক্তভোগী হবে মানবতা, কেননা তা অর্জিত হতে পারে কেবলই উভয়পক্ষে জান-মালের অভাবনীয় ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে।

ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের সাথে পাশাপাশি স্বাধীন সার্বভৌম দু’টো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মীমাংশায় পদক্ষেপ নিতে পারছে না তাদের ধর্ম-প্রসূত ইহুদী বিদ্বেষ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণে। এবং তাদের কষ্টটা আমরা সবাই অনুধাবন করতে পারি। কিন্তু সমস্যাটার একটা মানবতাবাদী সমাধানের জন্য তাদেরকে কষ্টটুকু হজম করা ছাড়া উপায়ও নেই। অথচ বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব ও তথাকথিত বামপন্থীদের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত লাফালাফি ও উস্কানি ফিলিস্তিনিদেরকে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ থেকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা স্বভাবতই ভাবে যে, ইউরোপ বা আমেরিকার বড়-বড় কাফের লেখকরাও (প্রধানত বামপন্থী) ইসরায়েলকে অবৈধ রাষ্ট্র বলছে; সারা মুসলিম জাহান ইসরায়েলকে অবৈধ বলছে এবং তারা আমাদের পিছনে আছে। তাহলে আমরা কেন ইসরায়েলকে মেনে নেব বা ছাড় দেব? ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যেকটি সুযোগ তারা একে একে হাত ছাড়া করছে। ফলাফল হচ্ছে, ফিলিস্তিনি মুসলিমদের অধিক ক্ষতি ও ভোগান্তি। মুসলিম বিশ্ব ও বামপন্থীদের এরূপ লাফালাফি ও ইসরায়েল বিদ্বেষী প্রচারণা ফিলিস্তিনিদেরকে আরও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ফিলিস্তিনিরা কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ হাত ছাড়া করছে:
উল্লেখ করা প্রয়োজন, আজ কেবলমাত্র হামাস, হেজবুল্লাহ, ইরান ও আসাদ সরকার (সাদ্দাম ও গাদ্দাফি সম্প্রতি তিরোহিত) এবং বিশ্বব্যাপী চরমপন্থী মুসলিম ও বামপন্থীরা– যারা ইসরায়েলকে অবৈধ রাষ্ট্র মনে করে এবং তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না। তারা ছাড়া সব সুস্থ মনের মানুষই ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বে বিশ্বাসী। ফিলিস্তিনের প্রায় ১৩% জনতাও সে মীমাংসা ন্যায্য মনে করে।

ঐতিহাসিকভাবে বার বার বিতারণ সত্ত্বেও ইহুদিরা কোননা কোনভাবে বিগত ২০০০ বছর ধরে বৃহত্তর ফিলিস্তিনে তাদের অস্তিত্ব ও বসবাস বজায় রেখেছে। ইসলামের ইতিহাসে নবি মুহাম্মদের হাতেই আমরা আরবাঞ্চলের ইহুদিদেরকে উৎখাত, গণহত্যা ও গণহারে ক্রীতদাসত্ব বরণের শিকার হতে দেখি। এবং নবির আমলেই ইসলামি বাহিনীর হাতে বর্তমান ফিলিস্তিন ভূখণ্ড আগ্রাসী আক্রমণের শিকার হতে থাকে এবং খলিফা উমরের আমলে (৬৩২-৬৪৪) মুসলিমদের ফিলিস্তিন দখল সম্পন্ন হয়। এছাড়াও ইসলামের সূচনাকালে বর্তমান ফিলিস্তিন, সিরিরা, ইরাক, ইরান, মধ্য এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও মিশর ছিল ইহুদিদের বসতির প্রধান কেন্দ্র। তৎকালীন বিশ্বের কমপক্ষে ৭৫% ইহুদি বাস করতো এসব অঞ্চলে, যা ইসলামি বাহিনী দ্রুত দখল করে নেয়। বাকী ইহুদিরা (২৫%) বাস করতো ইউরোপে। অথচ ১৯৩০-এর দশকে আমরা দেখি প্রায় ১২ মিলিয়ন ইহুদিদের বাস ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে, মুসলিম বিশ্বে মাত্র এক মিলিয়নেরও কম (যেখানে ৪০-৫০ মিলিয়ন প্রত্যাশিত)।

যাহোক, প্রায় দু’শো বছর ধরে ইউরোপে ইহুদিদের মুক্তি (Emancipation) ও সমৃদ্ধির পর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পরিস্থিতি তাদের জন্য সংকটজনক হয়ে উঠলে (মুসলিম বিশ্বেও ইহুদিদের অবস্থা বরাবরই সংকটজনক ছিল) কিছু কিছু সমৃদ্ধিশালী ও উদার ইহুদিরা তাদের আদি বাসভূমি ফিলিস্তিনের দিকে ধাবিত হয়, যা তখন অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। তারা মুসলিমদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে জায়গা কিনে (মুসলিমদের উৎখাত ও দখলের মাধ্যমে নয়) বসতি গড়া শুরু করে। অটোমান সরকারের শিথীলতার সুযোগে মুসলিম বিশ্ব থেকেও ইহুদিরা কম-বেশী আসা শুরু করে। হালকা বসতির ফিলিস্তিনে ইহুদিদের এরূপ আগমণে একদিকে আরব বিশ্ব থেকে মুসলিমদেরও আগমণ শুরু হয়, কেননা ইহুদিরা সেখানে নতুন অর্থনীতি ও কর্মস্থান সৃষ্টি করা শুরু করেছে। অন্যদিকে ১৮৯০-এর দশকে মুসলিমদের মাঝে ইহুদি বিদ্বেষও চাঙ্গা হতে থাকে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী কারণে।

শুরুতে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোন পারিকল্পনা ইহুদিদের মাথায় ছিল না। থাকেই বা কীভাবে? যেখানে তারা মূলত শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছে অটোমান মুসলিম সাম্রাজ্যে। তবে মুসলিমদের মাঝে ক্রমাগত বর্ধিষ্ণু ইহুদি বিদ্বেষ বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কিছু ইহুদির মাঝে ধীরে ধীরে ইহুদি রাষ্ট্রের ধারণা দানা বাধে, বিশেষত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি বিরোধী অবস্থান থেকে অটোমান সরকারের জার্মানিকে সমর্থনের পর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানী ও অটোমান সাম্রাজ্য হেরে যাওয়ার পর দখলকারী ব্রিটেন বৃহত্তর ফিলিস্তিনের প্রায় ৮০% ভূখণ্ড নিয়ে স্বাধীন জর্ডান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু জর্ডান সরকার সেখানে ইহুদিদের বসবাস নিষিদ্ধ করে। ফলে ফিলিস্তিনের বাকী অংশে আরেকটা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব তোলা হয়, যেখানে মুসলিম ও ইহুদিরা (জর্ডান থেকে বিতাড়িত ইহুদিসহ) পাশাপাশি বসবাস করবে। ইহুদিদের সাথে পাশাপাশি বসবাসে অনিচ্ছুক মুসলিমরা তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বিতারণের লক্ষ্যে শুরু করে দেয় ইহুদি বিরোধী সহিংসতা। ১৯২০ এর দশকেই ঘটে বেশ কয়েকটি ইহুদি গ্রামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষ গণহত্যা। প্রতিক্রিয়ায় ইহুদীরা প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করে এবং মুসলিম সন্ত্রাসী দলগুলোকে লক্ষ্য করে তারাও পাল্টা সহিংস অভিযান চালায়।

ফিলিস্তিনে এমন সহিংসতার মাঝে ইউরোপে শুরু হয় হিটলারের তাণ্ডবলীলা এবং অবশেষে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ইহুদী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে। ইতোমধ্যে ইহুদিদের ফিলিস্তিন থেকে উৎখাতের লক্ষ্যে সন্ত্রাসী অভিযানে লিপ্ত ফিলিস্তিনি আরব মুসলিমরা স্বভাবতই জাতিসংঘের সে প্রস্তাব মেনে নেয় নি। বিশেষত আরব ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব তখন তা প্রত্যাখ্যান করে। শুরু হলো ফিলিস্তিনিদের একে একে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ হাত ছাড়া ও অধিক ক্ষতি ভোগ করার পালা। কেননা ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের ভাগে ভূখণ্ডের পরিমাণ ছিল আরও বেশি। আরব ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের ইন্ধনে অধিক ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে ১৯৪৭ সালেই সমস্যাটা মীমাংসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল। জান মালের পাশাপাশি আরও ভূখণ্ড হারানোর পথে পা রাখল ফিলিস্তিনিরা।

এরপর ১৯৪৮ এ ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরদিনই ইহুদীরা জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাবের সীমানা অনুসারে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়। এবার আরব ও মুসলিম বিশ্ব তা মানল না এবং আরববিশ্ব ইসরায়েলকে ধ্বংসের লক্ষ্যে সাথে সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। এ প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলকে মেনে নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না। সূচনা হলো রক্তপাত, মানবতার লংঘন ও ফিলিস্তিনিদের ক্রমাগত হারানোর পালা। ১৯৪৮ এ আরব বিশ্বের সংঘবদ্ধ আগ্রাসী যুদ্ধে ইসরায়েল বহু কষ্টে কেবল জিতলই না, ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দ ভূখণ্ডের আরও বেশকিছু অংশ দখলও করে নিল। এবং ফিলিস্তিনিদের বাকী অংশ গাজা দখল করে নিল মিশর, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক দখল করলো জর্ডান (মজার ব্যাপার হচ্ছে, মিশর ও জর্ডান ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি গ্রাস করে নিল, অথচ ফিলিস্তিনিদের তথাকথিত পরম বন্ধু বৃহত্তর মুসলিম ও বামপন্থী জনতা তখন টু-শব্দটিও করলো না)।

এরপর ১৯৫৬ সালে আরববিশ্ব আবারও সংঘবদ্ধভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধের সূচনা করে এবং এবারও হেরে গেল। এভাবে ইসরায়েলের কাছে আরও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হারানোর ফলে যে নতুন নতুন সীমান্ত সৃষ্টি হল, তা-ই ১৯৬৭ এর সীমান্ত হিসেবে পরিচিত। যে সীমান্তের ভিত্তিতে সংঘাতটির মীমাংসা চাওয়া হচ্ছে আজ।

প্রশ্ন হলো, আরব ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের উগ্র গোড়ামির পরিণতি কী দাঁড়াল? কারা হলো তার প্রকৃত ভূক্তভোগী? ফলাফল ফিলিস্তিনিদের আরও ভূখণ্ড হারানো এবং জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি, এবং প্রধান ভূক্তভোগী কেবলই ফিলিস্তিনিরা, আর কেউ নয়।

১৯৬৭ যুদ্ধ
এরপর ১৯৬৭ সালে আবারও ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডামাঢোল তুলল আরববিশ্ব। ছয়দিনব্যাপী সে যুদ্ধে সম্মিলিত আরব বিশ্বের চরম পরাজয় ঘটল। ইসরায়েল মিশর থেকে সিনাই অঞ্চল ও গাজা উপত্যকা, জর্ডান থেকে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কসহ আরও ভূখণ্ড, এবং সিরিয়া থেকে গোলান হাইটস দখল করে নিল। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ ২৬২ নং প্রস্তাব (S/RES/242) পাশ করল, যার মূল বক্তব্য ছিল সম্পৃক্ত পক্ষগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতঃ দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এবারও আরববিশ্ব ও ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলকে ধ্বংসের খায়েশে জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করল। আজ আরবরা-সহ বিশ্ব যে ভিত্তিতে মীমাংশার কথা বলছে, সে সুযোগ ফিলিস্তিনিরা হাত ছাড়া করেছে ৪৫ বছর আগেই এবং সেটা ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় সুযোগ।

এরপর ১৯৭৩ সালে মিশর আবারও ইসরায়েল আক্রমণ করল। এবং মিশর যখন পরাজয়ের মুখে তখন ১৯৬৭ এর যুদ্ধে দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মিশর কর্তৃক ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দানের প্রতিশ্রুতিতে উভয়পক্ষ যুদ্ধ থেকে পিছু হটল। সে প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালে মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। তবে মিশর কেবল সিনাই অঞ্চল ফিরিয়ে নিল; গাজা অঞ্চল নিতে রাজী হল না।

এরপর যখন জর্ডান-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, তখন জর্ডানও ওয়েস্ট ব্যাংক ফিরিয়ে নিল না। এভাবে মিশর ও জর্ডান নিজেদের আখের গোছালো ফিলিস্তিনিদেরকে অকূল সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে। গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক ইসরায়েলের হাতেই রয়ে গেল। না ফিলিস্তিনি না আরববিশ্ব, কেউই ফিলিস্তিনিদের সমস্যার সমাধানে কোন প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এল। আর ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলকে ধ্বংসের প্রচেষ্টায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে চালাতে থাকলো।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালনাকারী আরাফাতের নেতৃত্বাধীন সংগঠন পিএলও ধীরে ধীরে অনুধাবন করছিল যে, সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইসরায়েলকে ধ্বংস করা অসম্ভব। ফলে ১৯৮০ এর দশকের শেষদিকে পাশ্চাত্য থেকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রনায়কের স্বীকৃতি এবং ভূড়ি-ভূড়ি আর্থিক অনুদানের প্রতিশ্রুতিতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দানে ও শান্তি স্থাপনের দিকে পা বাড়াল আরাফাত। পিএলও-র পান্তির পথে পা বাড়ানোর সাথে-সাথেই ইসরায়েলকে ধ্বংসের লক্ষ্যে হামাস ও অন্যান্য নতুন সন্ত্রাসী দলের উৎপত্তি এবং আরাফাতের ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দানে দৃঢ় প্রতিশ্রুতির অভাবে আজও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি স্থাপিত হয় নি। ***

এখানেই শেষ নয়, তথাপি আলোচনার এ পর্যায়ে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব ও বিশ্বের বামপন্থী জনতা ফিলিস্তিনিদের একের পর এক শান্তির সুযোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে ইসরায়েলকে ধ্বংসের কর্মকাণ্ডে বা মনোবৃত্তিতে উদ্দীপিত করে ফিলিস্তিনবাসীর কতোটা ক্ষতি করেছে, তা উপলব্ধি করা পাঠকের জন্য কঠিন হবে না। এবং ফিলিস্তিনিদের তথাকথিত পরম দোসরদের উস্কানির ফলাফল আজ যে পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, তা অনুধাবন করা যায় ফিলিস্তিনি মুসলিম সাংবাদিক খালেদ আবু তোয়ামেহ-র নিম্নোক্ত উক্তি থেকেঃ

"...ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হামাসের রকেট  মিসাইল ছুড়লেই বহু ফিলিস্তিনিরা যখন প্রকাশ্যে আনন্দ-উল্লাসে মত্ত হয়,তখন যে কেউ- ভাবতে পারে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনি জনতা কোনদিনও ইসরায়েলের সাথে কোন প্রকার আপোসেরাজী হবে কি না। আজকের ফিলিস্তিনিদের ভুবনে যে ইসরাইলের সাথে শান্তি স্থাপনের কথা বলে, সেই বিশ্বাসঘাতক শত্রুর সহযোগী; কিন্তু যে ইসরায়েলকে ধ্বংসের ডাক তোলে এবং তেল আবিব  জেরুজালেমের দিকে রকেট ছুড়ে সেইআদর্শ বীরপুরুষ।”

আমার বিশ্বাস, ফিলিস্তিনিদের মাঝে এমন মনোবৃত্তির যতদিন পর্যন্ত পরিবর্তন না হবে, ততদিন সেখানে শান্তি আসার কোনরূপ সম্ভাবনা নেই। এবং বহির্বিশ্বের শান্তিবাদী মানুষের উচিত ফিলিস্তিনিদের শান্তির পথে উদ্দীপিত করতে না পারলেও উলটো পথে আর লেলিয়ে না দেওয়া। অথচ বিশ্বব্যাপী পত্র-পত্রিকায় ও সামাজিক মাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে সেটাই করে আসছে ও করছে। বিগত দিনগুলোতে নজরে পরা এমন কিছু উস্কানি বা বিভ্রান্তকারী প্রচারণার নমুনা দেখুন:

  • ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের উপর অমানবিক ও বর্বর অত্যাচার, গণহত্যা চালাচ্ছে। ইসরায়েল নির্বিচারে শিশু হত্যা চালাচ্ছে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদি।
  • ইসরায়েল ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট একটি অবৈধ রাষ্ট্র।
  • ইহুদিরা তাদের পুরো আদি বাসভূমি পূনর্দখলের লক্ষ্যে ফিলিস্তিনকে একে একে গ্রাস করে চলেছে, যা কেবল সম্ভব গণহত্যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদেরকে নিশ্চিহ্ন করার মাধ্যমে এবং তাই-ই করে চলেছে তারা।
উপরে যে সামান্য আলোচনা হয়েছে, তাতে ইসরায়েলকে এমন জঘন্য বর্বর রাষ্ট্র মনে হয় কী? প্রাপ্ত তথ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে এসকল প্রচারণা আসল সত্যতা প্রতিফলিত করে না, যা নিচের আরোচনায় স্পষ্ট হবে।

ইসরায়েল কর্তৃক নির্বিচারে শিশু  বেসামরিক মানুষ হত্যা
ইসরায়েল নির্বিচারে শিশু ও বেসামরিক মানুষ হত্যা করছে এবং ফিলিস্তিনি নারী, শিশু পূর্বপুরুষদের অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে, এমন দাবি প্রায় ভিত্তিহীন। ফিলিস্তিনে যে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান হয়ে গেল, তা কোন অতীত পাপের প্রায়শ্চিত্ত নয়। বরং গাজা শাসনকারী হামাস সন্ত্রাসীদের ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট ও মিসাইল ছোঁড়ার প্রতিক্রিয়ামাত্র। গত কয়েক বছরে হামাস হাজার হাজার রকেট ও মিসাইল ছুড়েছে ইসরায়েলের দিকে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা এমন রকেট ও মিসাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য ইসরায়েল 'আয়রন ডোম' নামক এক আধুনিক যন্ত্র স্থাপন করেছে ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী লাইন ধরে। যা ইসরায়েল অভিমুখী রকেট ও মিসাইল নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সব রকেট ও মিসাইল নিষ্ক্রিয় করতে তা ব্যর্থ হয়। সংঘাতের বিগত দিনগুলোতে প্রতিদিন শ’য়ে শ’য়ে রকেট ছুড়েছে হামাস। তার বেশ কিছু ইসরায়েলের জনাকীর্ণ অঞ্চলে পড়েছে এবং দু’টো রকেটের আঘাতে অনেক ইসরাইলি মারাও গেছে। উল্লেখ্য, ইসরায়েল জাতিসংঘ বরাবরে একাধিকবার অসংখ্য চিঠি পাঠিয়েছে বার বার হামাসের রকেট ছুড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে, কিন্তু জাতিসংঘ তা উপেক্ষা করেছে; একবারও হামাসের নিন্দাও করে নি।

ইসরায়েল নির্বিচারে শিশু ও বেসামরিক মানুষকে আক্রমণ করে, এমন দাবিও সত্য নয়। হামাস সন্ত্রাসী কর্মীরা ইসরায়লি নিরীক্ষণ থেকে লুকানোর জন্য বাড়ির গ্যারেজে বা আঙ্গিনায় মিসাইল সেট করে, অনেক সময় মিসাইল ছুড়েই দৌড়ে আশ্রয় নেয় বউ-বাচ্চার কোলে, কখনো হাসপাতালে বা মসজিদে, কখনো এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে মিসাইল পরিবহনের জন্য। ইসরায়েল যখন এসব হামাস সন্ত্রাসীদেরকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়ে, তাদের সাথে তাদের বউ বাচ্চা, হাসপাতালের রোগী, মসজিদের নামাজীও মারা পড়েন। এটা কোনভাবেই এড়ানোর উপায় নেই।

‘ইসরায়েল যে নির্বিচারে গণহত্যা চালানো উন্মত্ত এক বর্বর জাতি’ - এমন ধারনাও যে সঠিক নয়, তা আবারও প্রমাণ করা যায় নিম্নোক্ত সত্যতার ভিত্তিতে। ২০০৫ সালে গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংক ছেড়ে চলে আসার পর ইসরায়েল কখনোই ওয়েস্টব্যাংক-এ কোন সামরিক আক্রমণ চালায় নি। কারণ ফাতাহ শাসিত ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে রকেট ছোড়া হয় না। হামাসের অপকর্মের জন্য যখন শিশুরা মারা যায়, তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে অন্য পথও খোলা নেই।

প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েল নয়, বরং আরব ও ফিলিস্তিনিরাই নির্বিচারে নারী-শিশু হত্যার দায়ে দায়ি। ইসরায়েল তার সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো জনবসতি থেকে অনেক দূরে রেখেছে। অথচ হামাস, হেজবুল্লা ও অন্যান্য আরব সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সর্বদাই তাদের রকেট ও মিসাইলগুলো সামরিক লক্ষ্যগুলোর দিকে না ছুড়ে ইসরাইলের জনবসতিগুলোর দিকে ছোড়ে। এমনকী ইসরায়েলের সাথে প্রতিটি যুদ্ধেই আরববিশ্ব প্রকাশ্যে ঘোষণাসহ ইসরায়েলের গণবসতিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করেছে এবং ইসরায়েল প্রত্যেকটি যুদ্ধেই কেবল সামরিক লক্ষ্য আক্রমণ করেছে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ইসরায়েলি আর্মি বিশ্বে অত্যন্ত সংযত ও সভ্য আচরণকারী আর্মি। এতগুলো যুদ্ধ ও দীর্ঘ সংঘাতের পরও তাদের বিরুদ্ধে কোন ধর্ষণের অভিযোগ নেই। অথচ পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন আর্মি নেই, যারা যুদ্ধে ধর্ষণে লিপ্ত হয় নি। আমাদের সেনাবাহিনীও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ীদের উপর যথেষ্ট পরিমাণ ধর্ষণ, নারী নির্যাতন চালিয়েছে। শুধু তাই-ই নয়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অত্যন্ত সংযত বলেই এবং জনবসতি আক্রমণ না করায় চারটি বড় যুদ্ধসহ প্রায় ৬৪ বছরের ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংঘাতে মারা গেছে মাত্র ৫০,০০০ এর মত মানুষ। এবং হামাস, পিএলও ইত্যাদি সন্ত্রাসী দলগুলো জনবসতির মধ্য থেকে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড না চালালে মৃতের সংখ্যা হয়তো আরও অনেক কম হত।

ইসরায়েল শান্তি চায় না, চায় সমগ্র ফিলিস্তিন দখল?
ইসরায়েলের সৃষ্টি ও পরবর্তী ঘটনার যে সংক্ষিপ্ত রূপরেখা উপরে উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে ইসরায়েল শান্তি চায় না এমন দাবি সঠিক মনে হয় না। বরং ফিলিস্তিনিরা যে শান্তি চায় না এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রকে নির্মূল করণের লক্ষ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার একাধিক সুযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করেছে; যা পাঠকের কাছে সুস্পষ্ট হওয়ার কথা। আরও সুযোগ প্রত্যাখ্যানের ঘটনা নিচে উল্লেখ করা হলো:

দৃষ্টি দেওয়া যাক, ১৯৯০ এর দশক থেকে আরাফাতের অধীনে শান্তি স্থাপন প্রচেষ্টা পর্বের উপর। ১৯৬৭ সালের জাতিসংঘ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আরাফাত অধীন পিএলও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় ইসরায়েলকে ধ্বংসের লক্ষ্যে। তবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের ধ্বংস অসম্ভব দেখে ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিকে ফিলিস্তিনের রাজত্ব ও বিপুল পশ্চিমা অর্থনৈতিক অনুদানের প্রলোভনে আরাফাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতির দানের পথে, তথা শান্তি স্থাপনের পথে পা বাড়ায়। এ মর্মে ১৯৯৩ সালে 'অসলো চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপস্থিতিতে ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতসাক রবিনের মাঝে স্বাক্ষরিত সে চুক্তিটির মূল বক্তব্য ছিলঃ "ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলকে ধ্বংস করার প্রয়াস পরিহার করে পাশাপাশি দু’টি রাষ্ট্র গঠনের জন্য আলোচনা চালাবে"। অথচ সে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ৮ মাস পর ১৯৯৪ সালের ১০ই মে তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণকালে আরাফাত জোহানেসবার্গের এক মসজিদে নামাজীদের সামনে এক গুপ্ত ভাষণে বলেনঃ
"I see this agreement as being no more than the agreement signed between our Prophet Muhammad and the Quraysh in Mecca. অর্থাৎ আমি এ (অসলো) চুক্তিটিকে নবি মুহাম্মদ ও মক্কার কুরাইশদের মাঝে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি (হুদাইবিয়া চুক্তি, ৬২৮) ছাড়া অন্য কিছু ভাবি না।"

উল্লেখ্য, ৬২৮ সালে নবি মুহাম্মদ মক্কা অভিযানে এসে মক্কাবাসীদের সাথে 'হুদাইবিয়া শান্তিচুক্তি' স্বাক্ষর করেছিলেন। কেননা তখনও মক্কা দখল করে নেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না তাঁর বাহিনী। এবং দু’বছর পর (৬৩০) যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠতেই তিনি ১০ বছর মেয়াদী সে চুক্তিটি ছুঁড়ে ফেলে মক্কা আক্রমণ ও দখল করে নেন। জোহানেসবার্গ মসজিদের সে ভাষণে আরাফাত 'জিহাদের মাধ্যমে জেরুজালেম জয় করার' উপর জোর দিয়ে আরও বলেন- “We now accept the peace agreement, but [only in order] to continue on the road to Jerusalem (আমরা এখন শান্তি চুক্তিটি মেনে নিচ্ছি, তবে কেবলই জেরুজালেমের পথে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসাবে).”

সুতরাং আরাফাত বলছেন- তাঁর স্বাক্ষরিত ১৯৯৩ সালের 'অসলো শান্তিচুক্তি'টি ছিল মূলত ইসরাইলের চোখে ধুলা দেয়ার জন্য এবং তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দান নয়, পরিণামে ইসরায়েলকে ধ্বংস করা। আরাফাতের এরূপ মনোবৃত্তিতে ইসরায়েলসহ পাশ্চাত্য, বিশেষত আমেরিকা, তাঁর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে সংগত কারণেই।

পিএলও সত্যি সত্যি ইসরাইলের সাথে শান্তি স্থাপনে আগ্রহী ছিল এমনটি মেনে নিলেও এটাও বিবেচ্য যে, আরাফাতের পিএলও এবং ফাতাহ পার্টি ফিলিস্তিনে অনেকটা দুর্বল শক্তি; জনগণের মাঝে তাদের সমর্থন খুবই দূর্বল। ২০০৬ এর জানুয়ারিতে ফিলিস্তিনে প্রথমবারের মতো যখন সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক নির্বাচন হল, তখন পিএলও/ফাতাহ দলটি হামাস পার্টির কাছে চরমভাবে হেরে গেল। এবং হামাস এর ঘোষণাপত্র (Manifesto) ইসরায়েলকে নিশ্চিহ্ন করার প্রতিজ্ঞা করেছে। যেমন হামাস ঘোষণাপত্র (১৯৮৮) তার ভূমিকায় বলছেঃ “Israel will exist and will continue to exist until Islam will obliterate it, just as it obliterated others before it.' [ইসরাইলের অস্তিত্ব থাকবে সেদিন পর্যন্ত, যেদিন ইসলাম তাকে নিশ্চিহ্ন করবে, ঠিক যেভাবে পূর্বে অন্যদেরকে নিশ্চিহ্ন করেছিল।]; অথবা অনুচ্ছেদ ৬ বলছেঃ “It (Hamas) strives to raise the banner of Allah over every inch of Palestine.”  [“হামাস ফিলিস্তিনের প্রত্যেক ইঞ্চি জায়গার উপর (অর্থাৎ ইসরায়েলসহ) আল্লাহর পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা করে যাবে।”]

ইসলামিক জিহাদ ও আল-আকসা মার্টারস ব্রিগেড হলো আরও দু’টো সহিংস ফিলিস্তিনি দল, যারা হামাসের মতো ইসরায়েলকে নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর। তারা ২০০৬ এর নির্বাচনে অংশ নেয় নি। ইসলামিক জিহাদ ও আল-আকসা মার্টারস ব্রিগেড হামাসের সাথে যোগ দিলে পিএলও/ফাতাহ নিঃসন্দেহে জলের মতো ভেসে যাবে তা বলাই যায়। এ প্রসংগে উল্লেখ্য, ২০০২ সালে নাবলুসের নাজাহ ইউনিভার্সিটির এক সমীক্ষায় ৮৭% ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেয় এবং ৮৭.৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলসহ ফিলিস্তিনের সমগ্র ভূখণ্ড জয় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে।

২০০৩ সালের এক সমীক্ষায় ৭০-৮০% ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী বোমা হামলা সমর্থন করে।  কাজেই কেন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে ইচ্ছুক ফাতাহ/পিএলও ইসরায়েলের ধ্বংসে বদ্ধিপরিকর হামাসের কাছে নির্বাচনে এমন শোচনীয়ভাবে হেরে যায়, সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হবে না। এমতাবস্থায় সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই দুষ্কর।

যাহোক, আমরা দেখেছি ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৭ সালে এবং আবারও ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরায়েল দু’বারই তা মেনে নিয়েছে। ফিলিস্তিনিরা আরেকবার শান্তি প্রতিষ্ঠার মোক্ষম সুযোগ প্রত্যাখান করে ২০০০ সালে। 'অসলো চুক্তি'র পরিণতিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি স্থাপনের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে ২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিডে। আরাফাত ও এহুদ বারাক-এর মাঝে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ছিলেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সৌদি প্রিন্স বন্দর। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পেশের আগের দিন ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট এহুদ বারাক প্রিন্স বন্দরকে প্রস্তাবের বিস্তারিত জানালে বন্দর অবাক হয়ে যায়। এবং বন্দর আরাফাতের রুমে গিয়ে তা জানালে আরাফাতও অবাক হয় এবং প্রস্তাব গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। প্রস্তাবটি ছিল, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের পূনর্বাসনের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলার দেবে এবং ১৯৬৭-এ দখলকৃত ভূখণ্ডের ৯৫% ফেরত দেবে। বাকী ৫% ফেরত দেবে না, কারণ তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরাফাত যে পরদিন প্রস্তাব গ্রহণ করবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকেও তা অগ্রিম জানানো হয়। এবং ক্লিনটনের উপস্থিতিতে পরদিন এহুদ বারাক যখন প্রস্তাবটি উপস্থাপন করল, আরাফাত সবাইকে বোকা বানিয়ে দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তাজ্জব হয়ে বন্দর আরাফাতকে বলেছিলেন, এটা তুমি কী করছ আরাফাত? প্রস্তাবটা নিয়ে নাও, জীবনে এমন প্রস্তাব আর পাবে না। আরাফাত কী চাচ্ছিল সে সম্পর্কেও কিছু জানিয়ে তিনি আলোচনা থেকে বেরিয়ে এলেন।

আরাফাতের এমন আজব আচরণে পরবর্তীতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ও প্রিন্স বন্দর দু’জনেই। দু’জনেই বলেছেন, আরাফাত বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারও কারও ধারনা, ইসরায়েলের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া আরাফাত ফিলিস্তিনিদেরকে খাওয়াতে পারবে, যে কারণে তিনি নিজস্ব প্রস্তাব উপস্থাপন না করেই আলোচনা ভঙ্গ করেছেন। ৮৭.৫ শতাংশ ফিলিস্তিনি (২০০২ সাল) যখন পুরো ইসরাইলের দখল চায়, তখন সে ধারনা যথেষ্টই সঠিক মনে হয়।

আরাফাত বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ার কারণেই আমেরিকান সরকার আর কখনো তার সাথে কথা বলে নি। আব্বাস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই আবার আমেরিকা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলা শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে কোন পক্ষ শান্তি চায়, কোন পক্ষ চায় না, তা এতোক্ষণে সুস্পষ্ট হওয়ার কথা সবার কাছেই।

উপরে বলা হয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনি জনতা, বা ৮৭.৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিরা, পুরো ইসরায়েল জয় করতে চায়। এবং এটাও স্বীকার করা প্রয়োজন যে, বিগত ৬৪ বছরের সংঘাতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছে যে, কিছু গোড়া ইসরায়েলি নাগরিকও এখন বৃহত্তর ইসরায়েলের স্বপ্ন দেখে। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে তাদের কোন ভূমিকা নেই।

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.