আব্দুল জলিল
মুহাম্মদের কল্পিত বোরাকমুহাম্মদের কল্পিত বোরাক

মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মহাকাশ অভিযান শুরু হয় ১৯৫৭ সালে। এ অভিযানে প্রথম সফলতা আসে ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই। প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার মাইল পথ ভ্রমণ শেষে (এপোলো-১১ নভোযানে) নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে প্রথম পা রাখেন। অথচ আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মিরাজ বা মহাকাশ বিজয়ের কথা আল কুরআনে ঘোষিত হয়েছে।

মানুষের প্রথম চন্দ্রগমণমানুষের প্রথম চন্দ্রগমণ

আল্লাহ বলেন-
“পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে (মুহাম্মদকে) রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখার জন্য, তিনিই সর্বশ্রোতা; সর্বদ্রষ্টা।“
- সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১

“নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয় নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছেন।“
- সূরা নাজম, আয়াত: ১৩-১৮

“অতঃপর তিনি তাঁর নিকটবর্তী হলেন, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাঁদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার তা করলেন।“
- সূরা নাজম, আয়াত: ৮-১০

“এভাবে আমি ইব্রাহিমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর পরিচালন ব্যবস্থা দেখাই, যাতে তিনি (ইব্রাহিম) নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।“
- সূরা আনআম, আয়াত: ৭৫

সূরা বনি ইসরাইলে মুহাম্মদ সাঃ-এর মক্কা (মসজিদুল হারাম) থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস (মসজিদুল আকসা) পর্যন্ত এবং সূরা নাজমে ঊর্ধ্বাকাশে উত্তোলন ও ভ্রমণের অর্থাৎ মহাকাশ ভ্রমণের কথা উল্লেখ রয়েছে। সূরা আনআমেও হজরত ইব্রাহিম-এর ক্ষেত্রে অনুরূপ মহাকাশ ভ্রমণের বিষয় ঘোষিত হয়েছে। নিল আর্মস্ট্রংদের চন্দ্র বিজয় সেদিনের কথা, তারও ১৪০০ বছর আগে মুহাম্মদ সাঃ এবং এরও আগে ইব্রাহিম আঃ-এর মিরাজ মহাকাশ বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বিজ্ঞান আজ যে জ্ঞানের কাছে মাথা নত করেছে অবশ্যই তা মানবীয় জ্ঞান নয় বরং ওহির জ্ঞান এবং 'মহাবিজ্ঞানী' আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান।

মসজিদুল হারামমসজিদুল হারাম
বাইতুল মোকাদ্দাসবাইতুল মোকাদ্দাস

আল কুরআনে কল্পনা বা মিথ্যার কোনো স্থান নেই, কোরআনে সবই সত্য। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে মুহাম্মদ সাঃ-এর মহাকাশ ভ্রমণকে কাল্পনিক বলার প্রশ্নই আসে না। এটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, মুহাম্মদ সাঃ-এর মিরাজ রূহানিকভাবে, নিদ্রাযোগে হয়নি, তা হয়েছে সজ্ঞানে সশরীরে এবং জাগ্রতাবস্থায়। যেমন হয়েছে মুসা আঃ-এর দলবলসহ হেঁটে নীল নদী পার হওয়া। ইব্রাহিম আঃ-এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি পাওয়া, ঈসা আঃ-এর আকাশে আরোহণ এবং আবার দুনিয়াতে আগমন হওয়ার কথা। বিবি মরিয়মের স্বামী ছাড়া পুত্রসন্তান লাভ। এসবই সত্য এবং বাস্তব ঘটনা। মুহাম্মদ সাঃ-এর মিরাজও চিরসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

মিরাজ বলতে মুসলিমরা যা বোঝেন-
মিরাজ অর্থ সিঁড়ি বা সোপান। মিরাজ শব্দটি আরবি ‘উরুজ’ শব্দ থেকে এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ উপরে আরোহণ করা। মুহাম্মদ সাঃ-এর বোরাকযোগে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা ভ্রমণ এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বে এবং ‘রফরফ’যোগে ঊর্ধ্বালোকে পরিভ্রমণের মাধ্যমে সৃষ্টির অনন্ত রহস্য ও অলৌকিক নিদর্শনাবলী অবলোকন, আল্লাহপাকের সান্নিধ্য অর্জন এবং উভয় বন্ধুর বাক্যালাপ।

আল্লাহ পাক ইচ্ছে করলে কোনরূপ অবলম্বন ছাড়াই মুহূর্তের মধ্যে তাঁর প্রিয় বন্ধুকে সপ্ত আকাশ পরিভ্রমণ করাতে পারতেন, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু ছিল না। তারপরও তিনি মুহাম্মদ সাঃ-কে ‘বোরাক’ ও ‘রফরফ’যোগে ভ্রমণ করিয়েছেন।

শিল্পীর কল্পনায় বোরাকশিল্পীর কল্পনায় বোরাক

অনেকের কৌতুহল জাগতে পারে, ‘বোরাক’ ও ‘রফরফ’ কী জাতীয় বাহন?

‘বোরাক’ আরবি ‘বরকুন’ ধাতু হতে নির্গত, যার অর্থ বিদ্যুৎ (Electricity)। এটা নূরের তৈরি জান্নাতি বাহন, যা বিদ্যুতের চেয়েও ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন। আলোর গতি অপেক্ষা এর গতি অনেক বেশি।

‘রফরফ’-এর আভিধানিক অর্থ বিছানা, নরম তুলতুলে, সবুজ। সূর্যরশ্মির চেয়েও ক্ষিপ্র তার গতিবেগ। এ রহমতি বাহন দু’টির গতি আলোর গতির চেয়েও কল্পনাতীত দ্রুত হওয়ার কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যে মুহাম্মদ সাঃ-এর সপ্তাকাশ ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, আলোর গতি প্রতি সেকেণ্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল।

বিরুদ্ধবাদীরা (নাস্তিক) বলেন, “পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি থাকায় শূন্য মণ্ডলের যে কোন স্থূল বস্তুকে সে নিচের দিকে টেনে নামায়। কোন স্থূলদেহী মানুষের দ্বারা মহাকাশ ভ্রমণ সম্ভব নয়”।

মহাকাশযন্ত্রমহাকাশযন্ত্র

অর্থাৎ মধ্যাকর্ষণ শক্তির দোহাই দিয়ে তারা মিরাজকে অস্বীকার করেন। বিরুদ্ধবাদী (নাস্তিক)-দের সে নীতিকে আধুনিক বিজ্ঞানীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। শূন্যে অবস্থিত যেকোনো স্থূল বস্তুকে পৃথিবী সব সময় সমানভাবে আকর্ষণ করতে পারে না, তা আজ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সত্য প্রমাণিত হয়েছে। তাদের মতে, প্রত্যেক গ্রহেরই নিজস্ব আকর্ষণ শক্তি রয়েছে। সূর্য ও পৃথিবী একে অন্যকে টেনে রাখছে। এ টানাটানির ফলে উভয়ের মাঝখানে এমন একটা স্থান আছে যেখানে কোনো আকর্ষণ-বিকর্ষণ নেই। যার ফলে পৃথিবীর কোনো বস্তু যদি সেই সীমানায় পৌঁছায় বা পার হয়ে সূর্যের সীমানায় যেতে পারে, তাহলে তা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবে না।

গতিবিজ্ঞানের (Dynamics) মতে, পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুকে প্রতি সেকেন্ডে ৬.৯০ অর্থাৎ সাত মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুড়ে দেয়া হলে তা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। আবার পৃথিবী থেকে কোনো বস্তু যতই ওপরে উঠবে ততই তার ওজন কমবে। যার ফলে অগ্রগতি ক্রমেই সহজ হয়ে যাবে।

আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলেন,
“পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুর দূরত্ব যতই বাড়ে, ততই তার ওজন কমে, পৃথিবীর এক পাউন্ড ওজনের কোন বস্তু ১২ হাজার মাইল ঊর্ধ্বে মাত্র এক আউন্স হয়ে যায়। এ থেকে বলা যায়, পৃথিবী থেকে যে যত ঊর্ধ্বে গমন করবে, তার ততই অগ্রগতি হবে।“
- The Exploration of Space, P-15

বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছেন, ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুটতে পারলে পৃথিবী থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। একেই মুক্তিগতি (Escape velocity) বলে। গতি বিজ্ঞানের এসব নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে মানুষ চাঁদে যেতে পেরেছে এবং মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। তাই মাধ্যাকর্ষের যুক্তি দিয়ে মুহাম্মদ সাঃ-এর মিরাজ গমনের সত্যকে কেউ উড়িয়ে দিতে পারে না।


নাস্তিকদের মতে, মুহাম্মদ সাঃ-এর দেহ জড়দেহ, তাই তা নভোলোকে পৌঁছতে পারে না। আল্লাহর সৃষ্টিজগতে দেখা যায়, বুনিয়াদ এক হলেও প্রতিটি বস্তুরই ভিন্ন ভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন, কয়লা থেকে হীরক প্রস্তুত হয়। উভয়ই পদার্থ। কিন্তু তাই বলে এ দু’টি পদার্থ এক নয়। তা ছাড়া সব পদার্থের সবখানেই ধর্ম এক নয়। যেমন কাঁচ জড় পদার্থ, বাধা দেয়া তার ধর্ম। এ জন্য একটা কাঠ ভেদ করে তার মধ্য দিয়ে আলোক রশ্মি  যেতে পারে না। কিন্তু কাঁচ জড় পদার্থ, তার বুকের ভেতর ভেদ করে আলোক রশ্মি চলে যায়, বাধা দিতে পারে না। আবার দেখা যায়, ‘পানি’র কঠিন, তরল ও বায়বীয় তিন অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন তিনটি রূপ, একটি থেকে অন্যটি ভিন্ন। এমন অনেক অস্বচ্ছ পদার্থ রয়েছে যার ভেতরে সাধারণ আলো প্রবেশ করতে পারে না কিন্তু রঞ্জন রশ্মি বা এক্সরে তা ভেদ করে চলে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা যে পদার্থকে দেখি তা-ই যে তার একমাত্র সত্য রূপ, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। মহান আল্লাহ মুহাম্মদ সাঃ-কে কুদরতীভাবে এই বিশাল পথ অতিক্রম করান। যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

মুমিনদের কল্পিত বোরাকমুমিনদের কল্পিত বোরাক

আধুনিক বিজ্ঞানীরা মহাশূন্যে যাওয়ার আগে নভোচারীদের দেহ খুব সতর্কতার সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উপযুক্ততা যাচাই-বাছাই করে থাকেন। বোরাকে সওয়ার হওয়ার আগেও মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর নির্দেশে জিবরাঈল আঃ রাসূলপাক সাঃ-এর বক্ষ সযত্নে বিদীর্ণপূর্বক জড়ধর্মী স্বভাব দূর করে আলোর স্বভাব স্থাপন করেন। গ্যাসীয় পদার্থের মধ্যে টিকে থাকার জন্য কুদরতি ওষুধ তাঁর শরীরে প্রয়োগ করেন। কল্ব মোবারকের মধ্যেও বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, যাতে মহাকাশ গমনের সময় তাঁর মধ্যে কোনো প্রকার ক্লান্তি না আসে, মহাকাশের নিদর্শনাবলি দেখে কোনো ভয়ভীতি সঞ্চার না হয় এবং আল্লাহর সাক্ষাত লাভের সময় যেন সৃষ্টি না হয় কোনো প্রকার বাধাবিপত্তি। এক কথায় ঊর্ধ্বজগতের বিভিন্ন কুদরত প্রত্যক্ষ করার ক্ষমতা লাভে তাঁকে সক্ষম করে নেন আল্লাহপাক। তাই আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে মিরাজকে অবৈজ্ঞানিক রূহানিক বা কাল্পনিক বলার প্রশ্নই আসে না। নবি মুহাম্মদের মিরাজ হয়েছিল স্বশরীরে, স্বজ্ঞানে ও জাগ্রতাবস্থায়।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভাষায় “স্ট্যান্ডার্ড টাইম বলে কোনো টাইম নেই, সব টাইমই লোকাল অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহর কাছে স্থান, কাল, গতি ও সময়ের কোনো বন্ধন নেই। তিনি যখন যা ইচ্ছা করেন মুহূর্তের মধ্যেই তা ঘটিয়ে থাকেন। তাঁর রহস্য সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অক্ষম।


নাস্তিকরা প্রশ্ন করেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে নবি মুহাম্মদ বাইতুল মুকাদ্দাস হয়ে সাত আসমানের ওপর সিদরাতুল মুনতাহা পেরিয়ে আল্লাহর সাথে কথাবার্তা বলে আবার মক্কায় ফিরে এলেন, তা কী করে সম্ভব!?”

ইসলামি সময়ইসলামি সময়

মূলত: আল্লাহর সময়ের সাথে মানুষের পৃথিবীর সময়ের মিল হবে না। বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের ঘড়ি অন্য গ্রহে অচল। এ বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞানীদের মত, স্বভাবের প্রকৃত সময় (True Time of Nature) সম্পর্কে আজো আমরা জানি না। বিজ্ঞানীরা জানান, আলোর গতির যতো নিকটে যাওয়া যায়, ততই সময় শ্লথ হয়ে আসে। আলোর গতি অপেক্ষা বেশি দ্রুত গতিতে গেলে সময় উল্টো দিকে বয়। মিরাজের বেলায়ও তা হয়েছিল। মুহাম্মদ সাঃ-এর বাহনের গতি আলোর গতি অপেক্ষা অবশ্যই বেশি ছিল। তাই মিরাজ থেকে ফিরে এসে উম্মে হানির গৃহে বিছানা উষ্ণ পাওয়ার বিষয়টিও সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.