হাসান মাসুদ, সাময়িকী.কম

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বৈধতাঃ পাকিস্তান বনাম ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা
'ইসরায়েল ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, ইসরায়েল অবৈধ রাষ্ট্র' – বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব ও বামপন্থীদের এমন প্রচারণা ফিলিস্তিনিদের শান্তির পথে এগুনোর পথে বড় বাধা। যা উপরে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয়, ইসরায়েল ধর্মের ভিত্তিতে গড়া রাষ্ট্র নয়। ইসরাইলের প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বদানকারী ইউরোপ থেকে আগত ইহুদিরা সবাই ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ ও উদারবাদী। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটা উদার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সৃষ্টি। যে কারণে গোড়া ইহুদিরা ইসরায়েল সৃষ্টির বিরোধীতাও করেছিল, এখনও করে। এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই একমাত্র দেশ, যেখানে রাষ্ট্র ও ধর্মকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ইসরায়েলের আশে পাশের রাষ্ট্রগুলোই বিশ্বের সর্বাধিক ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র।

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার মোটামুটি পটভূমি উপরে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করতে পারেন যে, ইসরায়েলের সৃষ্টি বৈধ ছিল না। সে দাবিতে কিছুটা সত্যতাও থাকতে পারে। তবে ইসলামি ও খ্রিস্ট্রিয় বিশ্বে ইহুদিরা যুগ যুগ ধরে যে চরম অত্যাচার, নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলকে মেনে নেয়া উচিত। তবে হ্যা, বৈধতার প্রশ্ন যদি তোলাই হবে, তবে আমার মতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার প্রায় একই সময়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি বা অতি সম্প্রতি ইসলামি কসভো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার চেয়ে খুব বেশী ন্যায় বা বৈধ নয়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সৃষ্টি করা হয়েছিল শুধুমাত্র মুসলিমদের দাবীর ভিত্তিতে। যে দাবির না ছিল কোন ন্যায়সংগত কারণ বা না জরুরী প্রয়োজন। এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে জাতিসংঘের মত কোন আধিপত্যকারী বা সম্মানজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বা সমর্থনও ছিল না। মুসলিমরা পাকিস্তানের দাবিতে ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি ব্যাপক দাঙ্গা, সন্ত্রাস ও গণহত্যা শুরু করে দেয় এবং তা এক বছরেরও বেশী অব্যাহত রাখে। বিশেষত বর্তমান পাকিস্তান অংশে, যার ফলশ্রুতিতে ব্রিটিশরা ভারতের বিভাজন ছাড়া কোন উপায় দেখে না এবং হিন্দুরা তা মেনে নিতে বাধ্য হয়।

মনে রাখতে হবে যে, মুসলিমরা আরব ও মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে এসে প্রায় এক হাজার বছর শক্তহাতে ভীতিমূলকভাবে শাসন চালিয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় মারা গেছে ৫ থেকে ৮ কোটি ভারতীয়; ক্রীতদাস করেছে তারও বেশী সংখ্যক (যারা সে প্রক্রিয়ায় মুসলিম হয়ে গেছে) ভারতীয় অমুসলিমকে, ধ্বংস করেছে হাজার হাজার মন্দির (আওরঙ্গজেবের আমলে ১৬৭৯ সালেই ২০০-এর বেশী মন্দির) ইত্যাদি। তার উপর ছিল অমুসলিমদেরকে অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষণকারী 'জিজিয়া', 'খারাজ' ইত্যাদি কর আরোপের মাধ্যমে শোষণ। কেবল সম্রাট আকবরের আমলে সাময়িকের জন্য কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল ভারতীয় অমুসলিমরা। প্রায় ১২০০ বছর পর মুসলিম-ব্রিটিশ দখলদারদের অধীনে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হওয়ার পর ভারতীয় হিন্দুরা যখন প্রথমবারের মত তাদের দেশের ভাগ্য নিজ হাতে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখল, তখনই ধর্মোন্মত্ত মুসলিমরা ভারতবর্ষকে ছিন্ন করে পাকিস্তান নামের আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে বর্বর সহিংসতা, গণহত্যা ও ধ্বংসকাণ্ড শুরু করে দিল। এবং ব্যাপক রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে পাকিস্তান সৃষ্টি করা হল।

অথচ ভারতের হিন্দুরা কখনোই পাকিস্তানকে ধ্বংস করার মনোবৃত্তি পোষণ করে নি, চালায় নি পাকিস্তানকে নিশ্চিহ্ন করার কোন প্রচেষ্টা, না তারা কখনো আত্মঘাতী বোমা-হামলাকারী বা সন্ত্রাসী দল পাঠিয়েছে পাকিস্তানে নিরীহ-নিষ্পাপ নারী-পুরুষ-শিশুকে নির্বিচারে হত্যা করতে। একইভাবে ভারতের বাইরে বসবাসকারী হিন্দুরা না কখনো চেয়েছে পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে, না পাঠিয়েছে পাকিস্তানের নিরীহ জনগণকে নিধন করতে আত্মঘাতী মানব বোমারু। অথচ বিশ্বের সব জায়গা থেকে মুসলিমরা ইসরাইলী রাষ্ট্রের বৈধতা অস্বীকার করে তথা ইসরাইলের ধ্বংস চায় এবং কয়েক বছর আগে দু’জন ব্রিটিশ মুসলিম নাগরিক ইসরাইলে যায় আত্মঘাতী বোমা হামলায় ইহুদীদেরকে হত্যা করতে।

ভারত-পাকিস্তান বিভাজন পরবর্তী যে প্রতিক্রিয়া ঘটেছে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিভাজন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার ঠিক উলটো। ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণের পরিবর্তে পাকিস্তান ভারতকে আগ্রাসীভাবে কয়েকবার আক্রমণ করেছে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে। শুধু তাই নয়, সমগ্র বিশ্বের মুসলিমরা ভারতের আরও বিভাজন চাচ্ছে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতা সমর্থন করে। ভারতের হিন্দুরা নিয়ত দেশের ভিতরের ও বাইরের মুসলিম সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে আজ। পাকিস্তানের তুলনায় ইসরায়েলের সৃষ্টি কোন অংশেই কম ন্যায্য ছিল না, কেননা আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে সেখানে ইহুদি জনগোষ্ঠী স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছিল এবং ইসলামের জন্মকালে সেখানে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বসবাস ছিল, যা ৬৩৪ সালে মুসলিমরা আগ্রাসী আক্রমণের মাধ্যমে জবরদখল করে নেয়। তদুপরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকস্টে নাৎসীদের ইহুদি নিধন অভিযান মানবিক কারণে একটি পৃথক ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা জরুরী করে তোলে।  বিশেষত খ্রিস্টান ও নবি মুহাম্মদের সময় থেকে মুসলিমদের হাতে বহু শতাব্দীব্যাপী ইহুদিদের উপর ব্যাপক অত্যাচার-নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের পরিপ্রেক্ষিতে। এমন কোন জরুরী সংকটের মুখে পাকিস্তান সৃষ্টি করা হয় নি। বরং পাকিস্তান সৃষ্টি করা হয়েছিল কেবলই মুসলিমদের ঘৃণাত্মক জাতি বিদ্বেষের কারণে। অর্থাৎ ভিন্ন ধর্মীয় লোকদের সাথে একত্রে মিলেমিশে বসবাসে অনিচ্ছার কারণে অথবা অমুসলিম প্রাধান্যের অথচ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে বসবাসে তাদের অনীহার কারণে।

১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগের পর পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ১০% থেকে আজ ১%-এ নেমে এসেছে এবং পূর্ব পাকিস্তানে তথা বর্তমান বাংলাদেশে তা ৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নেমেছে (বিপরীতে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ১০ শতাংশ কে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে) কিন্তু ইসরাইলের ভিতরে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিদেরকে ইসরায়েলে আমন্ত্রণ জানানো ও তাদের অভিবাসিত হওয়ার পরও। ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েল ত্যাগতো করছেই না, বরং বিয়ের মাধ্যমে বিশেষত ফিলিস্তিনি মেয়েরা ওপার থেকে ইসরায়েলে ঢুকছেও। এ ধারা চলতে থাকলে আজ থেকে ৪-৫ দশক পর সেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ইহুদিদের ছাড়িয়ে যাবে। অথচ ইসরায়েল সৃষ্টির পর আরব বিশ্বের সব দেশ থেকে ইহুদদিরা প্রায় পুরোপুরি বিতাড়িত হয়েছে (মোট প্রায় ৮ লাখ)।

ইসরায়েলের মুসলিম নাগরিকরা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাল জীবন-জীবিকা, মানবাধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করছে। ইসরায়েল কেবল কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করে নি, বরং ফিলিস্তিনিদের মতামত অনুসারেই ইসরায়েল বিশ্বের সর্বাধিক ভাল বা কাঙ্খিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেমন, ২০০৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক শিক্ষাবিদ খলিল শিকাকি কর্তৃক ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিবছর পরিচালিত সমীক্ষায় ফিলিস্তিনিরা প্রত্যেক বছর ইসরাইলি শাসন ব্যবস্থাকে তাদের সর্বাধিক পছন্দনীয় হিসেবে চয়ন করেছে, যার পরে এসেছে আমেরিকা ও ফ্রান্সের সরকারি ব্যবস্থা। আরব দেশগুলোর মধ্যে তাদের সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয় মিশর ও জর্দানী সরকার ব্যবস্থা, তবে তৃতীয় স্থানধারী ফ্রান্সের চেয়ে বিরাট ব্যবধানে পিছিয়ে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শাসন ব্যবস্থা মাত্র ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনিবাসীর পছন্দ।  এসব কারণে ইসরাইলের আরব মুসলিম নাগরিকদের ইসরায়েল ছেড়ে ভবিষ্যতে পাশাপাশি সৃষ্ট স্বাধীন ফিলিস্তিনে চলে যেতে বললেও তারা যাবে না।

আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, ইসরায়েলি নাগরিক মুসলিমদের সিংহভাগিই ইসরাইলের ধ্বংস দেখতে চায়। হামাস, হেজুবুল্লাহ ইত্যাদি সন্ত্রাসী দলগুলো ইসরাইলের দিকে রকেট ও মিসাইল ছুড়লে ইসরায়েলের অনেক মুসলিম নাগরিক রাস্তায় নেমে বা ছাদে উঠে উল্লাস করে। এমনকী ইসরায়েলি সংসদের (Knesset) মুসলিম প্রতিনিধি (এমপি) আজমি বিশারা ইসরায়েলের ধ্বংসে বদ্ধপরিকর অগ্রনায়ক ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমদিনেজাদ-এর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন- ইসরায়েলি রাষ্ট্র শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ডাকাতি এবং রাষ্ট্রটিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে স্থানান্তর করা উচিত।   আরেক মুসলিম ইসরায়েলি সংসদ সদস্য মোহাম্মদ বারাকেহ লেবাননে গিয়ে আজমি বিশারার সাথে এক সমাবেশে যোগ দিয়ে আরব বিশ্বকে সিরিয়ার হাত শক্ত করতে আহবান জানিয়েছেন। যে সিরিয়া ইরান ও লিবিয়ার পাশাপাশি আজও ইসরাইলি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করে না এবং ইসরায়েলকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্নকরণে বদ্ধপরিকর। সে সভায় আজমি বিশারা ঘোষণা দিলেন- “আমি কোনদিনই জায়নবাদকে (তথা ইসরায়েলকে) স্বীকৃতি দেব না সারা আরব বিশ্ব দিলেও।” তিনি আরও বলেন, “আমি কোনদিনই ফিলিস্তিন (অর্থাৎ ফিলিস্তিনের কোন অংশ) ছেড়ে দেব না। লড়াই এখনো অনেক লম্বা।”

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বনাম ইস্ট তিমোর’ ইন্দোনেশীয় আগ্রাসন
 ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি অঞ্চল দখল ও ইসরায়েলি সরকারের নিষ্ঠুরতার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছি আমরা। তবে মনে রাখতে হবে যে, ইসরায়েলকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে বার বার আক্রমণের মুখে ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ফিলিস্তিন, মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার কিছু ভূখণ্ড দখল করে নেয়। আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধগুলোর একটিতেও যদি ইসরায়েল পরাজিত হতো, তাহলে নিঃসন্দেহে আজ ইসরায়েল বলে কোন রাষ্ট্রের চিহ্ন থাকত না পৃথিবীর বুকে এবং সেখানকার ইহুদিদের ভাগ্যে কী ঘটতো, সেটা বুঝতে কারুর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এবং ইসরায়েল সর্বদা প্রস্তুত ছিল দখলকৃত সে ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিতে, কেবলমাত্র ইসরাইলি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দানের বিনিময়ে। এবং মিশর ও জর্ডান যখন ইসরায়েলের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে রাজি হল, তখনি ইসরায়েল দখলকৃত সে দেশগুলোর দখলকৃত ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিল। কিন্তু সিরিয়া ও ফিলিস্তিনবাসীরা ইসরাইলের ধ্বংসে বদ্ধপরিকর থাকায় কব্জাকৃত তাদের ভূখণ্ডের কোন মীমাংসা হয় নি। এবং শেষমেষ ফিলিস্তিনিদের স্বীকৃতি ছাড়াই ইসরায়েল দখলকৃত গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংক ছেড়ে দিয়ে চলে আসে সেপ্টেম্বর ২০০৫ এ।

অপরদিকে আরও অন্যায়ভাবে ১৯৭৪ সালে ইসলামি ইন্দোনেশিয়া ইস্ট তিমোর দখল করে নেয়। কিন্তু কোন মুসলিম ব্যক্তি বা দেশকে শুনি নি ইন্দোনেশিয়ার সে আগ্রাসী দখলকে নিন্দা করতে। বিশ্বের হিংসভাগ মুসলমানরা জানেও না ইন্দোনেশিয়ার আগ্রাসী ইস্ট তিমোর দখল সম্পর্কে। তদুপরি ইন্দোনেশিয়া ইস্ট তিমোরের উপর অত্যাচার-নির্মমতা চালিয়েছে ইসরায়েলের তুলনায় অনেক বেশি। ইন্দোনেশিয়া কর্তৃক ২৪ বছরের ইস্ট তিমোর দখলে মারা গেছে প্রায় ২০০,০০০ মানুষ। আর আরব-ফিলিস্তিনিদের দ্বারা বার বার যুদ্ধে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ ৬৪ বছর ফিলিস্তিন-ইসরায়েলি সংঘাতে মারা গেছে ৫০,০০০ এর মতো আরব-ফিলিস্তিনি। অথচ বিশ্বের প্রত্যেক মুসলিম ইসরায়েলী সরকারের নির্মমতার নিন্দায় পঞ্চমুখ ও মরিয়া। অন্যদিকে কোন মুসলিম নেতা, দেশ বা ব্যক্তিকে শোনা যায় নি ইন্দোনেশিয়ার আরও বেশী নির্মমতার এতটুকু নিন্দা করতেও। মনে রাখতে হবে, ইসরায়েলি সরকার নির্মমতা চালিয়েছে নিজ অস্তিত্বের উপর সতত মুসলিম-আরব-ফিলিস্তিনি হুমকির মুখে, কিন্তু ইস্ট তিমোরবাসী কখনোই ইন্দোনেশিয়ার অস্তিত্বের জন্য কোনরূপ হুমকি ছিল না।

ইসরায়েলের বৃহত্তর প্যালেস্টাইন দখলের পায়তারা? 
মুসলিম ও অনেক বামপন্থীদের প্রচারণা যে, ইসরায়েল তার ঐতিহাসিক আদি বাসভূমি পুরোটাই দখল করতে চায়, সে সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা হয়েছে উপরে। এ বিষয়ে আরেকটু আলোচনা করা প্রয়োজন। ইসরায়েলিরা তাদের ঐতিহাসিক বাসভূমি দখলের লক্ষ্যে সম্প্রসারণমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, তা প্রমাণ করতে নিম্নোক্ত ম্যাপটি ছড়ানো হচ্ছে ইন্টারনেটে।

Palestinian Loss of Land 1946 to 2010Palestinian Loss of Land 1946 to 2010
Jewish Loss of Land 1000 BCE to 2013Jewish Loss of Land 1000 BCE to 2013

এর সাথে ইসরায়েল-বিরোধীদের আরও একটি দাবি উল্লেখ করা প্রয়োজন। তা হচ্ছে, ১৮৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘে ফিলিস্তিনের বিভক্তি প্রকল্পে ইসরায়েল পায় ৫৪% জায়গা, যদিও ইহুদি জনসংখ্যা ছিল ফিলিস্তিনিদের অর্ধেক।

১) ইহুদিরা তাদের পুরো হারানো ভূমি উদ্ধার করতে চায়, এমন দাবি যে সঠিক নয়, তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে উপরে। তারপরও বলা প্রয়োজন, এমনভাবে ম্যাপ উপস্থাপন সঠিক চিত্র প্রতিফলিত করে না, বরং তা অত্যন্ত বিভ্রান্তি তৈরি করে। প্রথমত, ম্যাপটি থেকে ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইনের প্রায় ৮০% ভূখণ্ড বাদ পড়েছে, যা আজ ফিলিস্তিনি-মুসলিম রাষ্ট্র জর্ডান রূপে পরিচিত। ইসরায়েলিরা যদি তাদের ঐতিহাসিক বাসভূমি পুরোটাই দখলে বদ্ধপরিকর হতো, তাহলে জর্ডানকে কোনদিনই স্বীকৃতি দিত না।

২) ম্যাপটি এটাও প্রতিফলিত করে যে, ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা সংখ্যায় মুসলিমদের অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও বেশি ভূখণ্ড পেয়েছে। কিন্তু ম্যাপে প্রদর্শিত ইসরাইলি অংশের বৃহত্তর অঞ্চল (প্রায় ৫৫ শতাংশ) যে নেগেভ মরুভূমি, যা বসবাসের অযোগ্য, সেটা প্রতিফলিত হয় নি। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে ইহুদিরা যখন আসতে শুরু করে, তারা স্বভাবতই দেখতে পায় যে, ফিলিস্তিনের বাস ও আবাদযোগ্য এলাকা, যেমন জর্ডান, ওয়েস্টব্যাংক গাজা ও ইসরাইলের অংশবিশেষ জনবসতিতে পূর্ণ। ফলে তাদেরকে আবাদ অযোগ্য মরুভুমি প্রান্তরের দিকে বসতি স্থাপন করতে হয়। সে কারণে নেগেভ মরুভূমি ইসরাইলের পাশে পড়ে যায় দেশভাগের সময়। অবশ্য এটাও উল্লেখ্য যে, ইহুদিরা তাদের নতুন বসতির আশে-পাশের বেশকিছু আবাদ অযোগ্য জায়গা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবাদযোগ্য করে তুলেছে। মোটকথা, ১৯৪৭ সালের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মাঝে বাসযোগ্য ভূখণ্ডের বণ্টন জনসংখ্যার অনুপাতে ন্যায্য ছিল; ইহুদিদের অতিরিক্ত জায়গা দেওয়া হয় নি, বরং কম দেয়া হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে ইসরাইলের সীমারেখার যে পরিবর্তন ম্যাপটিতে দেখানো হয়েছে, তার সঠিকতা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। তবে কিছু পরিবর্তন যে হয়েছে, তা উপরের আলোচনাতেই ফুটে উঠে।

শেষ কথা
পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও বিশ্লেষণে এটিই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সমস্যার সার-সংক্ষেপ ও সঠিক চিত্র। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যা ধর্ম, জাতীয়তা ইত্যাদি মিলিয়ে একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা, বিশেষত ফিলিস্তিনিদের জন্য। এবং এ প্রসঙ্গে আমরা সবাই যা প্রচার করি, তা যেন সমস্যাটার চিরস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে হয়। তা যেন ইসরায়েলি বা ফিলিস্তিনি কোন পক্ষকেই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ থেকে সরে দাড়ানোর উস্কানি না দেয়; তা যেন সত্যতাকে প্রতিফলিত করে। এই আলোচনায় যথেষ্ট দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ে আমরা যা কিছু প্রচার করি, তা সত্যের চেয়ে মিথ্যাকেই বেশি প্রতিফলিত করে। আর তা ফিলিস্তিনিদেরকে শান্তির পথ থেকে আরও বিচ্যূত ছাড়া কিছুই করছে না।

অস্বীকার করার উপায় নেই, দু-এক বছর পর পর ইসরায়েল যখন গাজাতে (ওয়েস্ট ব্যাংকে নয়) অভিযান চালায় এবং নারী-শিশু মারা যায়, তা সবার জন্যই অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তবে দোষ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা যেন ভুলে না যাই যে, গাজা অঞ্চলে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের কারণ হামাসের অপকর্ম, তথা ইসরাইলি জনবসতির উপর মিসাইল ও রকেট ছোড়া, নারী-শিশুদের মাঝে অবস্থান নিয়ে। হামাসের মত রকেট ছুড়লে প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের কোন দেশই ইসরাইলের তুলনায় অধিক সভ্য আচরণ করবে না। বিশেষত দু’পক্ষের মাঝে শক্তির অনুপাত যদি অনুরূপ হয়। সর্বোপরী হামাস ও ফিলিস্তিনিরা (৮৭.৫ শতাংশ) ইসরায়েলকে ধ্বংসের স্বপ্নে বিভোর না থেকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দানের পথে পা বাড়ালে তবেই মানবতা, বিশ্বশান্তি অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে পারবে অন্যথায় নয়।


তথ্যসূত্র:
i) খালেদ আবু তোয়ামেহ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংঘাতঃ আরব দৃষ্টিভঙ্গি, নবযুগ ব্লগ, ২০ নভেম্বর ২০১২ (ব্লগটি এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না)
[1] Daniel Pipes (1994) [Al-Hudaybiya and] Lessons from the Prophet Muhammad's Diplomacy, Middle East Quarterly, September 1999
[2] Friedman, Thomas, New York Times, March 18, 2002
[3] Myre, Greg, “Israel Stems Suicide Bombings, but at a Cost,” New York Times, 5 April 2003
[4] পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারে পড়ে দেখুন এম,এ খান-এর “জিহাদ” বইটি, পৃঃ ২৬৮-৩০৪ (ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা)।
[5] Bennet, James, “Letter from the Middle East,” New York Times, 2 April 2003
[6] Arab MK: Israel ‘robbery of century’, http://www.ynetnews.com/articles/0,7340,L-3186040,00.html

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.