মৃম্ময় বড়ুয়া মিল্টন, সাময়িকী.কম

ফ্রুটস ভ্যালী : একটি দৃষ্টিনন্দন ফল উপত্যকা
শাহজীবাজারে অবস্থিত হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের পাহাড়ের টিলায় প্রায় ৩ একর জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে মনোরম ফলের বাগান, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ফ্রুটস ভ্যালী’ বা ফলের উপত্যকা। দেশী-বিদেশী বহু দূর্লভ এবং বিলুপ্তপ্রায় ২০০ জাতের বিভিন্ন ফলের সমারোহে ফ্রুটস ভ্যালীটি পরিপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন জাতের গাছ থেকে ইতিমধ্যে ফল আসা শুরু হয়েছে যা বৃক্ষ প্রেমিকদের মাঝে আলোড়ন ও কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। প্রতিনিয়ত বহু দর্শণার্থী দূর্লভ ফল বাগান দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছে। কিন্তু স্থানটি গ্যাস ফিল্ডের অভ্যন্তরে হওয়ায় পর্যটকরা দেখতে পারছে না। ১৩ জাতের পাখি এবং ৮ জাতের বিভিন্ন ধরণের কবুতর, খরগোশ ও বানর রয়েছে এ ফল উপত্যকায়। গড়ে তোলা হয়েছে ওষুধি গাছের মিউজিয়াম।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজিবাজারে হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ড অবস্থিত। এই ফিল্ডটি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানী লিমিটেড-এর অন্তর্গত পেট্রোবাংলার একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা ফিল্ডের এলাকাধীন অব্যবহৃত পাহাড়ের টিলায় তৈরি করেন এই ‘ফ্রুটস ভ্যালী’। ফ্রুটস ভ্যালীর মূল পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন গ্যাস ফিল্ডের উপ-ব্যবস্থাপক ইনচার্জ (ফিল্ড-প্রশাসন) এটিএম নাছিমুজ্জামান। পশু-পাখি এবং ফলের এই ভ্যালীটি প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশী বহু পশু-পাখি এদের সান্নিধ্যে এসে ফ্রুটস ভ্যালীতে নির্বিঘ্নে বিচরণ করে যা পরিবেশের জন্য সহায়ক ও মঙ্গলজনক। ফ্রুটস ভ্যালীর প্রবেশ পথের ডান পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন জাতের পেয়ারার বাগান।
রাস্তার দুই পাশ দিয়ে লাগানো হয়েছে সুপারি গাছ যা প্রথম দর্শনেই দর্শণার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পেয়ারার বাগানের উত্তরের পাহাড়ের ঢালে রয়েছে বিভিন্ন জাতের আমের গাছ। এই গাছে ঝুলে থাকা আমগুলো খুবই দৃষ্টিনন্দিত। পাহাড়ের উত্তরে এক পাশে পেঁপে, অন্য পাশে লিচু বাগান। লিচু বাগানের বেদানা লিচু এক দুর্লভ সংগ্রহ যা প্রতিটি দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। মহুয়া, পেস্তা বাদাম, আশফল, তৈকর, ফলসা বৈ-চি ফলের গাছগুলো রয়েছে ফ্রুটস ভ্যালীর মাঝখানে। বাগানের উত্তর পাশে টিলার ঢালে রয়েছে অমৃত সাগর ও হীমসাগর কলার বাগান।
দুর্লভ এবং নতুন উদ্ভাবিত বেনিসন আম সত্যিই দর্শনীয় বৃক্ষ। এই আমের রং, স্বাদ এবং আকার যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। টিলার মাখানে ট্যাং আর থোকা থোকা আঙ্গুর দেখে দর্শণার্থীরা অভিভূত হন এবং ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ান। থমকে দাঁড়ান ২৪ ইঞ্চি সাইজের অতি ক্ষুদ্র গাছে থোকা থোকা আম ঝুলতে দেখে। এই বারমাসী আমের গাছে এক ডালে আম অন্য ডালে মুকুল যা সত্যিই দুর্লভ এবং অবিশ্বাস্য দৃশ্য। ফ্রুটস ভ্যালীর পশ্চিম পাশে বিভিন্ন জাতের খরগোশ এবং পূর্ব পাশে রয়েছে দূর্লভ প্রজাতির বিভিন্ন পাখি যা ফ্রুটস ভ্যালীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে করেছে অধিকতর প্রাকৃতিক। প্রতিনিয়ত বাইরে থেকে পাখি এসে এদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে ফ্রুটস ভ্যালীটি পশু-পাখিদের জন্য হয়ে উঠেছে অভয়ারণ্য চারণ ভূমি।
সর্ব পশ্চিমে এক কোণায় রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং তার পাশে রয়েছে ৮ জাতের কবুতর। অতি দৃষ্টিনন্দিত ২টি টার্কি পুরো ভ্যালী দর্শণার্থীদের সাথে ঘুরে বেড়ায়, ওদের পেখম মেলানো নাচ প্রতিটি দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। ফ্রুটস ভ্যালিতে যে লিপস্টিক তেঁতুলের গাছটি রয়েছে তা বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রায়। রয়েছে দেশের সবচেয়ে উঁচু বৃক্ষ বাইলাম গাছ। এ সব গাছের সাথে রয়েছে অনেক দেশের বরেণ্য ব্যক্তির ছোঁয়া। কারণ এখানে আসা বরেণ্য ব্যক্তিরা দূর্লভ গাছের চারা রোপণ করেছেন। হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারিসহ তাদের পরিবারবর্গের প্রতিটি সদস্যদের দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগান দিয়ে চলছে এই ফ্রুটস ভ্যালী। বছরের ১২ মাসই বিভিন্ন ধরণের ফল ও সবজি এই ফ্রুটস ভ্যালীতে পাওয়া যায়।
ভবিষ্যতে কোম্পানী কর্তৃপক্ষ ফ্রুটস ভ্যালীকে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে এটি একটি লাভজনক এবং দৃষ্টান্তমূলক কৃষি খামার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ছোট পরিসরে পারিবারিক পরিমন্ডলে পুষ্টি যোগানদাতা হিসেবে এই ফ্রুটস ভ্যালী একটি মডেল হিসেবে সমাদৃত হবে। যে কেউ এ ধরণের বাগান করে অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হতে পারবে। ফ্রুটস ভ্যালী তৈরির মূল উদ্দেশ্য মানুষের মাঝে আত্ম চেতনাবোধ জাগ্রত করা এবং সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশ গড়া। এই ফ্রুটস ভ্যালীতে রোপিত বিরল এবং বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির ফল সংরক্ষণ করে সারা দেশে এর বংশ বিস্তারের প্রয়াস চালানো হবে।
যাতে ক্ষুদ্র কৃষক সীমিত পরিসরে এ ধরণের বাগান বা খামার প্রতিটি বাড়িতে তৈরি করে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে এবং দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা এবং সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে তৈরি হয়েছে ফ্রুটস ভ্যালী। ফ্রুটস ভ্যালির স্বপ্ন দ্রষ্টা এটিএম নাছিমুজ্জামান এই ফলগুলোর বর্ণনা দিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন্ যার নাম ‘বাংলাদেশের যত ফল’। তিনি জানান, নিছক শখের কারণেই বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু গ্যাস ফিল্ডের অভ্যন্তরে হওয়ায় এবং এটি কেপিআই হওয়ায় পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
হবিগঞ্জ সরকারী বৃন্দাবন কলেজেন উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক সুভাষ দেব জানান, ফ্রুটস ভ্যালি শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়। চাইলে উদ্ভিদের গবেষণার জন্য এটি ব্যবহার করা সম্ভব। তিনি এটিকে পর্যকটকদের জন্য উন্মুক্ত করতে বিকল্প রাস্তা গড়ে তোলার আহবান জানান।
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.