নারায়ণগঞ্জে অপহরণের পর সাত খুনের ঘটনায় আস্তে আস্তে নিজের অবস্থান বদলেছেন সেখানকার আলোচিত সাংসদ শামীম ওসমান। শুরুতে তিনি বলেছেন, নূর হোসেন এ কাজ করতে পারেন না। এখন তিনি বলছেন, নূর হোসেনসহ যাঁদের এই মামলায় আসামি করা হয়েছে, তাঁরা সবাই অপহরণের ঘটনায় জড়িত।
স্বামী অপহরণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শামীম ওসমানের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম। গতকাল সোমবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ঘটনার পরপরই শামীম ওসমানের কাছে ছুটে যাই। আমি তাঁকে বলি, নূর হোসেন আমার স্বামীকে অপহরণ করেছে। আপনি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। তিনি আমাকে বলেন, নূর হোসেন এই কাজ করতে পারেন না।’
৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যার পাড় থেকে নজরুলের লাশ উদ্ধারের পর সেলিনা ইসলাম বিলাপ করতে করতে বলেছিলেন, ‘কোর্টে যাওয়ার আগে সকালেও শামীম ওসমানকে ফোন করে আমার স্বামী বলেছিল, “ভাই, হাজিরা দিতে যাইতেছি, আমারে সেইফ কইরেন।” এমনই সেইফ করল’— বলে বিলাপ শুরু করেন তিনি।
তবে গত রোববার সিদ্ধিরগঞ্জে নজরুলের স্মরণসভায় শামীম ওসমান বলেন, নূর হোসেনসহ যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাঁরাই এ ঘটনার জন্য দায়ী। সভামঞ্চে সেলিনা ইসলাম ও তাঁর বাবা নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন। শামীম ওসমান তাঁর বক্তৃতায় এলাকাবাসীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই এলাকার দায়িত্ব আমি শহীদ চেয়ারম্যানকে দিয়ে গেলাম।’
শামীম ওসমানের বিভিন্ন সময় দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাপরম্পরা মিলিয়ে এখানকার রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, অপহরণের ঘটনায় যাঁর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, সেই কাউন্সিলর নূর হোসেন শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ লোক। নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন, পুলিশ এমনকি র‌্যাব—সবার ওপর ছিল এঁদের প্রভাব। ফলে প্রথমে নূর হোসেন, র‌্যাব ও সেই সূত্রে শামীম ওসমানের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হলেও তাঁরা বিষয়টি পাত্তাই দেননি। কিন্তু সাত-সাতটি লাশ উদ্ধারের পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দেরিতে হলেও র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়, লাশ উদ্ধারের তিন দিন পর নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এর পরই বদলাতে থাকে শামীম ওসমানের কথাবার্তা।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, সিদ্ধিরগঞ্জে বালু-পাথরের ব্যবসা, পরিবহনে চাঁদাবাজি, নদী দখল, মাদক ব্যবসাসহ সব রকম অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে নূর হোসেনের সংশ্লিষ্টতা আছে। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা আছে।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রাকচালকের সহকারী (হেলপার) হিসেবে জীবন শুরু করা নূর হোসেন ১৯৯২ সালে বিএনপির সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের হাত ধরে যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর শামীম ওসমান দেশ ছাড়লে তিনিও এলাকা ছাড়েন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাঁকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলে লাল নোটিশও জারি করা হয়।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনের পর শামীম ওসমানের পাশাপাশি নূর হোসেনও এলাকায় ফেরেন। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু নূর হোসেন নির্বাচন করেন এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হন।
এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সিদ্ধিরগঞ্জে শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের অসংখ্য পোস্টার ও বিলবোর্ড। সর্বশেষ গত ১৮ এপ্রিলও নারায়ণগঞ্জ শহরের রেলগেটে আওয়ামী লীগের সমাবেশে একই মঞ্চে ছিলেন শামীম ওসমান ও নূর হোসেন।
শামীম ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নূর হোসেন আমার কর্মী ছিল। কিন্তু সে যে এত বড় অপরাধী, সে যে নজরুলকে খুন করে ফেলতে পারে, এটা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এখন আমি সব বুঝতে পারছি। তাই নূর হোসেনের ব্যাপারে আমার অবস্থান বদলেছে।’
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে এক সমাবেশে শামীম ওসমান (বাঁয়ে) ও নূর হোসেন । ফাইল ছবিতবে ভুক্তভোগী পরিবারসহ নারায়ণগঞ্জের একাধিক বিশিষ্টজন বলছেন, সময় বুঝেই এখন নূর হোসেনের বিরুদ্ধে বলছেন শামীম ওসমান। অথচ ২৭ এপ্রিল নজরুল অপহরণের পর সাংবাদিকেরা খোঁজ করে জানতে পারেন, নূর হোসেন ও শামীম ওসমান একসঙ্গে রাইফেল ক্লাবে আছেন। সেখানে গেলে শামীম ওসমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘নূর হোসেন কখনোই নজরুলকে হত্যা করতে পারেন না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম ওসমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘নজরুল ও নূর হোসেন দুজনেই আমার কর্মী ছিল। আমি কখনোই ভাবিনি, নূর হোসেন এভাবে অপহরণ করে হত্যা করতে পারে। নজরুল কিছুদিন আগে আমার কাছে এসে জানিয়েছিল, তাকে মেরে ফেলা হবে। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সবাইকে বলে দিয়েছিলাম। সর্বশেষ মামলার হাজিরা দিতে কোর্টে আসার আগে আমার সঙ্গে নজরুল দেখা করতে এসেছিল। আমি তখন তার জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য আইনজীবী আনিসুর রহমানকে বলে দিই। আমি তাকে বলেছিলাম, একা চলাফেরা কোরো না। পাঁচ-ছয়জন লোক নিয়ে থেকো। আমি ভেবেছিলাম, বেশি লোকজন থাকলে কেউ তার কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তার পরও তাকে মেরে ফেলা হলো।’
ঘটনার পরপরই নজরুলের পরিবার নূর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও আপনি নূর হোসেনের পক্ষ নিয়েছিলেন। জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, নূর হোসেন সর্বোচ্চ হাতাহাতি করতে পারে। কিন্তু সে যে এভাবে নজরুলকে মেরে ফেলবে, সেটা আমি বুঝতে পারিনি।’
আপনার কাছে তো অনেক আশা নিয়ে এসেছিল নজরুলের পরিবার। জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘সবাই মনে করেছিল, আমি কিছু করতে পারব। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, আমি অসহায়।’
নজরুল অপহরণের পরেও তো আপনাকে নূর হোসেনের সঙ্গে দেখা গেছে। জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘নজরুলের পরিবার অভিযোগ দেওয়ার পরেই আমি তাকে রাইফেল ক্লাবে ডেকে এনেছিলাম। কিন্তু সে নজরুলকে অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করে।’
আপনার গত দুই দিনের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, আপনি নূর হোসেনের বিষয়ে অবস্থান বদলেছেন। জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘অবস্থান না পাল্টে উপায় আছে। যে সিডি পেয়েছি তাতে সব পরিষ্কার।’
এখনো কেন নূর হোসেন গ্রেপ্তার হচ্ছেন না জানতে চাইলে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমারও তো একই প্রশ্ন। আমি মনে করি, নূর হোসেনকে গ্রেপ্তার করলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’
নজরুলের লাশ উদ্ধারের পর শামীম ওসমানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছিলেন সেলিনা ইসলাম। কিন্তু রোববার একসঙ্গে স্মরণসভায় তিনি বক্তব্য দিলেন। কেন? জবাবে সেলিনা ইসলাম বলেন, ‘আমাকে তো স্বামী হত্যার বিচার পেতে হবে। আপনারা বলেন, আমি এখন কী করব? কই যাব?’

শরিফুল হাসান ও আসিফ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.