আপনার চারপাশের এক ধরনের চাপ, যা আপনাকে প্রভাবিত করে। তাই দেহ-মনে স্ট্রেস তৈরি করে। স্ট্রেস দেহের বাইরে ও ভেতরের উভয় ফ্যাক্টরের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাইরের ফ্যাক্টর হচ্ছে ভৌত পরিবেশ, যেমন- আপনার কর্ম, অন্যের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক, আপনার বাসা প্রভৃতি। এছাড়া প্রতিদিন যে সমস্যা আপনি মোকাবেলা করেন, যেমন- কাজের অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, সমস্যা ও প্রত্যাশা।
স্ট্রেস লক্ষণ ও উপসর্গ
স্ট্রেসের লক্ষণ বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, যা মানসিক, আচরণগত ও শারীরিক হতে পারে। স্ট্রেসের লক্ষণ ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হতে পারে। স্ট্রেস সহনশীলতা একেকজনের একেক রকম হয়।
শারীরিক (ফিজিক্যাল) লক্ষণ
* ঘুমের ব্যাঘাত* মাংসপেশিতে টান (টেনশন)* মাথাব্যথা* পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা (কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া বা বদহজম)* ক্লান্তি*ব্যাক পেইন* শ্বাসকষ্ট* ঘাড় বা চোয়াল শক্ত বোধ করা* দেহের ওজন বাড়া বা কমা
মানসিক ও আচরণগত লক্ষণগুলো হচ্ছে
* স্নায়ুবিক দুর্বলতা* দুশ্চিন্তা* খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, যেমন- অতিরিক্ত খাওয়া* অনাগ্রহতা*উদ্যমহীনতা বা কর্মচাঞ্চল্যের অভাব* পরিবর্তিত মেজাজ (মুডি)* বিষণ্নতা* অন্যের সঙ্গে আপনার সম্পর্কে সমস্যা* স্কুলে খারাপ ফলাফল
স্ট্রেসের জন্য কারা ঝুঁকিপূর্ণ
স্ট্রেসের মাত্রা আমাদের জীবনে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। ব্যক্তিগত ফ্যাক্টরগুলো হচ্ছে নিজের স্বাস্থ্য, আন্তব্যক্তিক সম্পর্কের মান, আমাদের কমিটমেন্ট ও দায়িত্বের সংখ্যা, আমাদের ওপর অন্যদের নির্ভরশীলতার মাত্রা, আমাদের প্রত্যাশা, অন্যদের কাছ থেকে কতটা সহায়তা আমরা পাই এবং কতটা পরিবর্তন বা কতটা বেদনাদায়ক ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটেছে।
যারা অপুষ্টিতে ভোগেন, যাদের ঘুম অপর্যাপ্ত, যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ, তাদের প্রাত্যহিক চাপ এবং স্ট্রেস আয়ত্তে আনার ক্ষমতা কম এবং তারা সাধারণত উচ্চমাত্রার স্ট্রেস অনুভব করে। যেমন- শিশু, টিনএজ, কর্মজীবী মা-বাবা ও প্রবীণ লোকদের স্ট্রেস তাদের বয়সের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
টিন স্ট্রেস
শিশুকাল থেকে বাড়তি চাপের কারণে এক ধরনের স্ট্রেসের মুখোমুখি হয়। এ বয়সে অতিরিক্ত স্ট্রেস পরবর্তী সময়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন- বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি।
স্বাভাবিক স্ট্রেস রেসপন্স
স্ট্রেসে রেসপন্স সঙ্গে সঙ্গে হতে হবে। মানবদেহে স্ট্রেস রেসপন্সের তিনটি উপাদান আছে-
মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স করে
এ রেসপন্স অ্যাড্রেনাল মেডোলাকে সংকেত দেয় এপিনেফ্রিন ও নর-এপিনেফ্রিনকে দেহে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য।
হাইপোথ্যালমাস (মস্তিষ্কের একটি কেন্দ্রীয় এলাকা) এবং পিটুইটারি গ্লান্ড সংকেত পাঠায় অ্যাড্রেনাল কর্টেক্সকে দেহে কর্টিসল এবং অন্যান্য হরমোন ছাড়ার জন্য ধীর রেসপন্স বজায় থাকে।
স্নায়ুজাতীয় সার্কিট কাজ করে আচরণগত রেসপন্সের জন্য। এ রেসপন্স সতর্কতা বাড়ায়, অধিকতর মনযোগী করে, যৌন ইচ্ছাকে নিরুৎসাহিত করে, ব্যথা কম অনুভূত হয় এবং আচরণকে প্রভাবিত করে।
এ সম্মিলিত প্রয়াসে দেহের অন্তঃভারসাম্য (হোমিওস্টেসিস) বজায় রাখে, শক্তি উৎপাদন ও এর ব্যবহার বাড়ায় এবং দেহের ইলেকট্রোলাইট (দেহের এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান) ও তরলের ভারসাম্য অপরিবর্তিত থাকে। এগুলো দেহকে দ্রুত কাজ করার জন্য সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে উজ্জীবিত করে, যা হৃদস্পন্দন, উচ্চরক্তচাপ, রক্তকে হৃৎপিণ্ড, মাংসপেশি ও মস্তিষ্কের দিকে পুনর্ধাবিত করে, রক্তকে পরিপাকতন্ত্র থেকে সরিয়ে নেয় এবং দেহে জ্বালানি সরবরাহ করে।
স্ট্রেসের পরিণতি
অনিয়ন্ত্রিত, অনভিপ্রেত ও নিরন্তর স্ট্রেস আমাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থের ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন- অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, বিষণœতা, উচ্চরক্তচাপ, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, পরিপাকতন্ত্রে ডিজিজ, ক্যানসার ও দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া। স্ট্রেস মাইগ্রেন ও অ্যাজমা হওয়ার হার ও ব্যাপ্তি বাড়ায় এবং ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করার পরিমাণও ওঠানামা করায়।
মাদক বা নিকোটিনে আসক্ত হওয়ার আশংকাও বেড়ে যায় দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসে।
স্ট্রেস কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন
*সর্বপ্রথম আপনাকে জানতে হবে, আপনি কখন স্ট্রেসড।
*যেটা আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না, যেমনÑ আবহাওয়া।
*ছোট সমস্যা আগে সমাধান করুন, যা আপনাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এনে দেবে।
*একসঙ্গে অনেক সমস্যা সমাধানে না নেমে একটা করে সমাধান করুন।
*দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান, পরিবর্তনকে ভীতিকর না দেখে ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখুন।
*আপনার সমস্যার ব্যাপারে বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন।
*বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করুন, বাড়াবাড়ি রকমের শিডিউল করবেন না।
*সময়মতো এবং সুষম খাবার খান।
*নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
*ধ্যান (মেডিটেশন) করুন।
*এমন কিছু করুন, যা আপনার কাছে স্ট্রেসফুল বলে মনে হবে না, যেমন- স্পোর্টস, সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা শখের কিছু করা (হবি)।
*নিজেকে সর্বোত্তম বা শ্রেষ্ঠ করার জন্য ব্যস্ত থাকবেন না।
ডা. মোঃ ইফতেখার হাসান খান
লেখক : ফ্যামিলি মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ 
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.