কৃষি ও তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রবাসীদের আয়ই মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করেছে। এক সময় আমদানি-রফতানির ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হতো। সেখানে প্রতি মাসে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। বর্তমানে প্রবাসীদের আয়ের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ হাজার ৯৫০ কোটি ডলারের ওপরে পৌঁছেছে। তবে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে প্রবাসী আয় ৬ শতাংশ কমে গেছে, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক খবর। প্রবাসী আয় হ্রাসের এ প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
মার্চ মাসে প্রবাসীরা ১২৭ কোটি ৩৩ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছে, যা একক মাস হিসেবে এটা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইতিপূর্বে এ বছরের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২৬ কোটি ডলার রেমিটেন্স আসে। ফেব্র“য়ারি মাসে রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১১৭ কোটি ৩১ ডলার। দেখা যাচ্ছে, মার্চ মাসে রেমিটেন্সের পরিমাণ ফেব্র“য়ারি মাসের তুলনায় প্রায় ১০ কোটি ২ লাখ ডলার এবং আগের অর্থবছরের মার্চ মাসের তুলনায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার বেশি।
প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ আদম বেপারিদের প্রতারণার শিকার হন। ফলে বিদেশে গিয়ে অনেক প্রবাসীকে অমানবিক জীবন-যাপন করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকরা যথাযথ প্রতিকারও পায় না। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ জন্য অসাধু আদম বেপারিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোয় লোকবলের সমস্যা রয়েছে- এ কথা সত্য। তবে তার চেয়েও বেশি সত্য, তাদের দায়িত্বে অবহেলা। যাদের আয়ে তাদের বেতন-ভাতা হয়, সেই প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের কাছে ন্যূনতম সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পান না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের মনোভাব পরিবর্তনের পাশাপাশি সহনশীল হওয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে একটি ইংরেজি দৈনিকে বলা হয়েছে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হয়ে আসার কারণে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গেছে। চলতি অর্থবছরে এই প্রবাহ আরও কমে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন অনেকে। ২০০৯ সাল থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভিসা ইস্যু বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে অপেক্ষাকৃতভাবে কর্মসংস্থান কম হওয়া ও অনেক অবৈধ, অদক্ষ এবং অভিযুক্ত শ্রমিক দেশে ফিরে আসায় রেমিটেন্স প্রবাহ নিুমুখী হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। জনশক্তি ব্যুরোর হিসাব অনুসারে ২০১১ সালে মোট কর্মসংস্থান হয়েছে ৫,৬৮,০৬২; ২০১২ সালে ৬,০৭,৭৯৮ এবং ২০১৩ সালে মোট কর্মসংস্থান হয়েছে ৪,০৯,২৫৩ জনের। উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর থেকে মার্চ- এ তিন মাসে মোট ৯৬ হাজার ৬৮ জন বাংলাদেশী চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধির জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাব কিছুটা হলেও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া, কাতার, বাহরাইনে কর্মসংস্থানের সুযোগ আশানুরূপভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়াও সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রেও সরকার যথাসময়ে সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার করতে পারলে জনশক্তি রফতানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি বলেছেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ রয়েছে, তা থেকে পদ্মা সেতু তৈরি প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দেয়া যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে দেশের জনশক্তি রফতানির ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করে আরও বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুর্দ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।
আবুল কালাম আজাদ, উপ-ব্যবস্থাপক (কার্যক্রম), পিকেএসএফ, ঢাকা
azad—pksf-bd.org
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.