শরীর-মনে নতুন কিছুর হাতছানি। নিজের পরিবর্তনে নিজেই চমকায়। বয়ঃসন্ধিকালের মতো এত নাজুক সময় বোধকরি আমাদের আর আসে না। তাই স্বাভাবিক কারণেই এ সময়ে মা-বাবারা সন্তানদের নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। কিছু স্পর্শকাতর বিষয় ছেলেমেয়েদের বলা উচিত হবে কি হবে না, এ প্রশ্ন ইদানীং অনেক সচেতন মা-বাবার মধ্যে থাকে। যে প্রশ্নটা প্রথমেই আসে, সেটা হলো, সন্তানের শরীরের বাহ্যিক ও জৈবিক যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে কথা বলার আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, আর প্রয়োজন থাকলে কতটুকুই বা বলা উচিত? দুই. সন্তানের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ধীরে ধীরে যে আগ্রহ ও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে, সেটা কতটুকু প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে? তিন. বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় মাদক নিয়ে তাদের সন্তানদের কতটুকু সচেতন করবেন?
.যৌনবিজ্ঞান শিক্ষা কেন জরুরি?
বয়ঃসন্ধি হওয়ার পর শারীরিক যে পরিবর্তনগুলো ঘটে, সেগুলো এমনই আকস্মিক যে এগুলো সম্পর্কে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলে বিষয়টি অনেক কিশোর-কিশোরীর কাছেই হয়ে উঠতে পারে ভীতিকর, অস্বস্তিকর। শরীরের বাইরের পরিবর্তন কিশোর-কিশোরীরা মেনে নিলেও জৈবিক পরিবর্তনগুলো বুঝে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয়।যেমন: ছেলেদের আকস্মিক যেসব জৈবিক (শারীরবৃত্তীয়) পরিবর্তন ঘটে, তা না বুঝে তারা ভাবতে পারে তাদের কোনো বড় ধরনের (যৌন) রোগ হয়েছে কি না। তাদের মনে আরও যেসব প্রশ্ন মাথায় আসে, সেগুলো হলো, ‘বিষয়টি কি শুধু তাদের ঘটছে’, ‘এমন কেন হচ্ছে...’, ‘ভবিষ্যতে কোনো ক্ষতি হবে কি না’ ইত্যাদি। তা ছাড়া এ বয়সে কিশোর-কিশোরীদের, বিশেষত ছেলেদের কিছু একান্ত ব্যক্তিগত অভ্যাস তৈরি হতে পারে, যা নিয়ে থাকে তাদের অহেতুক নানা শঙ্কা। শারীরবৃত্তীয় বিষয়ের পাশাপাশি নারী-পুরুষের বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয় নানা কৌতূহল।
একটা বিষয় মনে রাখবেন, আপনি অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে যদি না তাদের এসব শঙ্কা, কৌতূহল সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য দিয়ে না মেটাতে পারেন, তারা কিন্তু ঠিকই কোনো না কোনোভাবে এসব জেনে নেবে। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা নির্ভর করে বন্ধুবান্ধবদের মনগড়া তথ্য এবং অন্যান্য অবৈজ্ঞানিক উৎসের ওপর। ফলে ভুলে ভরা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এসব তথ্যে তারা আরও বিভ্রান্ত হয়, যা অনেক সময় মনের গঠনের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এ সময় কৌতূহলবশত না বুঝে নানা কিছুর অভিজ্ঞতা নেওয়া বিচিত্র কিছু নয়। সন্তানের সঙ্গে যত বেশি আপনি খোলামনে কথা বলতে পারবেন, সঠিক তথ্য দিয়ে কৌতূহল মেটাতে পারবেন, তার ভুল পথে যাওয়ার ঝুঁকিও তত কম হবে।
আপনার সঙ্গে এই যোগাযোগের মাধ্যমে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভিত্তিটাও মজবুত হবে। এসব আলোচনা আপনার প্রতি তার একধরনের আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করবে।
কীভাবে বলবেন, কতটুকু বলবেন?
মানসিক প্রস্তুতি
বয়ঃসন্ধির একটু আগে থেকেই সন্তানের শরীরের বাহ্যিক কী কী পরিবর্তন হবে, সে সম্পর্কে হালকাভাবে এবং ইতিবাচক ভঙ্গিতে জানিয়ে রাখুন।
ছেলেমেয়ে দুজনের ক্ষেত্রেই তাদের শরীরের ভেতরে যে নতুন ও আকস্মিক পরিবর্তন ঘটবে, সেগুলো জানান।
পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখান
বিষয়গুলো বলার সময় যতটা সম্ভব স্বাভাবিকতা বজায় রাখুন। এগুলো যে জীবনের এক অত্যন্ত সাধারণ প্রাকৃতিক বিষয়, তা তাকে বুঝিয়ে বলুন।
এসবের কারণে তার জীবনে এক বিরাট কিছু ঘটে গেছে বা বিরাট পরিবর্তন হয়ে গেছে, সে ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকুন।
শিশুমনকে অস্বীকার নয়
‘তুমি এখন বড় হয়ে গেছ’, ‘তোমার এখন আগের মতো থাকলে চলবে না’, ‘তোমার দায়িত্ব অনেক’ ইত্যাদি কথা না বলাই ভালো। মনে রাখবেন, আপনার সন্তান শিশু অবস্থা থেকে মাত্র একটা সন্ধিক্ষণে পড়েছে। নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট সময় দিন।
ভালোবাসতে শেখাব নিজেকে
 ছেলেদের মতোই মেয়েদের ক্ষেত্রে তার শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে এমনভাবে বলবেন, যাতে শরীর নিয়ে অহেতুক অস্বস্তিবোধ তার না তৈরি হয়।
 নারী-পুরুষের বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে হালকা ও প্রাথমিক ধারণা দিন। এসব বিষয়ে তার মনে কোনো প্রশ্ন বা সংশয় থাকলে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলুন।
মেলামেশায় কতটুকু প্রশ্রয়?
ছেলেমেয়েদের স্বাভাবিক মেলামেশা, খেলাধুলা করতে দিন। ‘নিষেধ’ যেকোনো জিনিসের প্রতিই কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়।
কৈশোরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যে ভালো লাগা তৈরি হতে পারে, সেটা জানান। এ সময় আবেগের প্রাচুর্য থাকে বলে যেকোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে বলে এ বিষয়ে সন্তানকে হালকা করে জানান।
ছেলেমেয়েদের পারস্পরিক সম্মানবোধ
বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই ছেলে ও মেয়েদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করতে শেখান। মেয়েদের প্রতি আগ্রহ যাতে তারা ভুলভাবে প্রকাশ না করে (যেমন: উত্ত্যক্ত করা, বাজে মন্তব্য করা ইত্যাদি), সেটা আলাদা করে বলুন।
কিশোরী মেয়েদের ছেলেদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য, যেমন: ‘ছেলেরা খারাপ’, ‘ছেলেদের কাছ থেকে দূরে থাকবে’ ইত্যাদি বলা থেকে বিরত থাকুন। এ ধরনের মন্তব্য অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের মধ্যে পুরুষদের সম্পর্কে অহেতুক অবিশ্বাস তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীকালে এমনকি দাম্পত্য জীবনেও পুরুষদের প্রতি আস্থা তৈরি হতে বাধা দিতে পারে।
অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করুন
কারও স্পর্শ সেটা যে-ই হোক বা যত সাধারণই হোক, সেটা যদি তাদের খারাপ লাগে তবে সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবাকে যাতে বলে দেয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে বলুন।
মাদক নিয়ে কী বলবেন?
 মাদক নিয়ে হালকাভাবে এর নেতিবাচক ও ক্ষতিকর নানা দিক সম্পর্কে জানান। মাদক সেবনে যে একধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়; শারীরিক, সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি হয়, সে বিষয় বলুন।
 ‘মাদক গ্রহণ খারাপ’—এভাবে সরাসরি না বলে কেন এটা খারাপ, সেটা বুঝিয়ে বলুন। বিষয়টি সম্পর্কে না জানা থাকলে ভালো করে জেনে বলুন।
মেখলা সরকার
লেখক: মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.