মাসের শুরুর দিনগুলো খুব ভালো যায়। বন্ধুদের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডা আর ঘোরাফেরায় বেশ কাটে দিনগুলো। খাওয়া-দাওয়া, কেনাকাটায় ব্যস্ততায় খুব দ্রুত কেটে যায় মাসের প্রথম পনেরোটা দিন। কীভাবে যে যায়, তাও বুঝতে পারেন না।
কিন্তু মাসের অর্ধেকটা সময় যাওয়ার পরেই বুঝতে পারেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে! পরের দিনগুলো নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। কমতে থাকে আড্ডা। কমতে থাকে খাওয়া-দাওয়া কিংবা কেনাকাটা। দিন পাঁচেক পর বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা, ‘মাসের অনাগত দিনগুলো যাবে কীভাবে?’ হ্যাঁ, যারা ব্যাচেলর, জব করেন কিংবা পড়াশোনা করছেন ঢাকায়, তাদের বেশিরভাগেরই এই ঘটনা অতি পরিচিত। এমন কোনো মাস নেই যে, এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়নি তাদের।
যারা পড়াশোনার পাশাপাশি জব করেন কিংবা টিউশনি করেন, তাদের এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সবচেয়ে বেশি। মাসের শুরুতে পেয়ে যান নগদ টাকা এবং এরপর বেশ আনন্দে চলে যায় কয়েকটা দিন!হলের ক্যান্টিন কিংবা মেসের খাবার না খেয়ে ভালো হোটেলে গিয়ে ভালো ভালো খাবার আর বন্ধুদের খাইয়ে খরচা হয়ে যায় একটা বড় অংশ। আবার বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কেনাকাটাও করে ফেলেন অনেক সময়। পকেট গরম থাকায় তার কিছুই হয়তো বোঝা যায় না। কিন্তু পকেটটা একটু ঠাণ্ডা হয়ে আসতেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। হাত খসখস করতে থাকে! কেননা মাসের এক তৃতীয়াংশ তখনও বাকি যে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মাশকুরুল ইসলাম বলেন, ‘সারা মাস তিনটা টিউশনি করি। মাস শেষে এমাউন্টটাও পাই ভালোই। কিন্তু আবার মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট ফাঁকা হয়ে যায়। মাসের শেষ কয়েকদিন টানাটানি আর ধারকর্য করে চলতে হয়। আবার মাসের শুরুতে এসে ঠিক হয়ে যায়।’ এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেননি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার চিন্তা করি, এবার খরচ কমিয়ে ফেলব, একটু কিপটামি করে চলব, কিন্তু পারি না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর বেলায়ই এমনটা ঘটে থাকে। সে পাঁচ হাজার টাকা আয় করুক, আর বিশ হাজার টাকাই আয় করুক। কিন্তু যে ছেলেটি পাঁচ হাজার টাকা আয় করছে, তার মাসটাও কিন্তু খারাপ যাচ্ছে না। কিংবা বিশ হাজারের তুলনায় যে দশ হাজার পাচ্ছে, তার দিনগুলোও কিন্তু ভালোই যাচ্ছে। আবার এটাও ঠিক দশ দিয়েও যেমন যাচ্ছে, বিশ দিয়েও তেমনই দিন যাচ্ছে একজনের ক্ষেত্রেই। তাহলে তো ঘাপলা আছেই বলতে হয়। এমন যারা আছেন, তারা কেউ-ই হিসাব করে খরচাপাতি করেন না এটা নিশ্চিত। পকেটে টাকা যতক্ষণ থাকে, দু’হাত ভরে খরচ করেন। পকেট ফাঁকা হলে ঘুম ভাঙে তাদের! কিন্তু ঘুম ভাঙলেও তাদের আর কিছু করার নেই। তখন চিন্তায়, দুশ্চিন্তায় ধারদেনা করে মাসের বাকি দিনগুলো চলতে হয়।
অথচ একটু হিসাবপাতি করে চললেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না তরুণদের। মাস শেষেও পড়তে হবে না টানাপোড়েনে। খুব ভালোভাবেই পার হয়ে যাবে মাসের সব ক’টা দিন। মাসের সব ক’টা দিন যেন ভালোভাবে যায়, তার জন্য কয়েকটা পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে।
  • মাসের শুরুতে টাকা পাওয়ার পরই কিছু টাকা আলাদাভাবে জমিয়ে রাখুন। ভাববেন এই টাকা আপনার হাতে নেই। বাকি টাকাগুলো দিয়ে পুরো মাস যেতে হবে, এমন একটা পরিকল্পনা করে ফেলুন। আর মাসের শেষে একান্তই যদি টাকা শেষ হয়ে যায়, তাহলে জমানো টাকাগুলো বের করে অনায়াসে দিনগুলো কাটান।
  • বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দিন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আড্ডা মানেই খাওয়া-দাওয়া নয়, চা পান করেই দীর্ঘ সময় জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায়। যেখানে গিয়ে আড্ডা দিলে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে যাবে, সেই স্থান পরিহার করুন।
  • টাকা থাকলেই প্রতিদিন ভালো হোটেলে গিয়ে দামি খাবার কিংবা মাছ-মাংস খেতে হবে, তার কোনো কারণ নেই। ছাত্র জীবনে বড় হোটেলের দামি খাবারগুলো এড়িয়ে চলুন। হ্যাঁ, মাসে হয়তো একদিন যাওয়া যেতে পারে। তবে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে গেলে একটা পরিকল্পনা করুন, একদিন আপনি বিল দিলে অন্যদিন অন্য কেউ দিবে। যদিও দিলখোলা তরুণদের বেলায় এটা মানা কষ্টের। টাকা না থাকলেও ধার করে খাওয়ানোই তাদের অভ্যাস। তবে এই অভ্যাস দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। নতুবা সমস্যার সমাধান তো হবেই না। বিয়েশাদীর পর সমস্যা আরও প্রকট হবে! বউ-ও পালাতে পারে!
  • কেনাকাটার পরিমাণ কমিয়ে দিন। পরিধানযোগ্য একটা পোশাক থাকার পরেও আরেকটা কেনা মানে অপচয় করা। তাছাড়া যেহেতু মাস শেষে এই পোশাকটাই আপনাকে ভোগান্তিতে ফেলবে, তাই অপচয় থেকে দূরে থাকুন।
  • দিলদরিয়া অনেকেই বন্ধুদের খাওয়ানোর ব্যাপারে যেমন এগিয়ে থাকে, তেমনি ধার দেওয়ার ব্যাপারেও ওস্তাদ থাকে। কাউকে সহযোগিতা করা অবশ্যই ভালো। অথচ মাস থেকে ধার দেওয়া টাকাও পাওয়া যায় না, ফলে সমস্যায় পড়তেই হয় উল্টো। তাই যতদূর সম্ভব ধার দিন হিসাব-নিকাশ করে এবং নির্দিষ্ট সময়ে টাকা পাওয়া যাবে কী না? সেই বিষয়টিও মাথায় রাখুন।
  • সব শেষে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিদিন রাতে ফেরার পর কিংবা ঘুমানোর আগে আপনার সারাদিনের খরচাপাতির হিসাবটা কষে নিন এক নজর। কখন কোথায় কীভাবে কেন কত টাকা খরচ হলো, সেটা পারলে টুকে রাখুন আপনার ডায়েরিতে। নিয়মিত এই হিসাবটা কষলে আপনার কাছেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এতে কোথায় অযথা খরচ হচ্ছে, তা আপনার নখদর্পণে থাকবে। তখন পুরো মাসের চিন্তাটাও আপনার মাথায় থাকবে। তখন এমনিতেই খরচের বিষয় এবং মাসে চলার বিষয় আপনার চোখে পড়বে। কাজেই নিয়মিত হিসেবটা রাখুন। এতে বিষয়টা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।
মাসটা কেমন যাবে, এখনও সেই চিন্তাই করছেন নাকি? যেমনই যাক না কেন, এক মাস এই পদ্ধতিতে চলেই দেখুন না কোনো পরিবর্তন আসে কী না? চেষ্টা করতে তো সমস্যা নেই। তাছাড়া মানুষের জীবনটাই পরিবর্তনশীল। এতে আপনার উপকারই হবে।

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.