নূর হোসেনের মাদক সাম্রাজ্যে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা মাদক 

বাবার মাদক স্পট থেকে ফেনসিডিল সেবনে মাদকাসক্ত হয়েই গত বছর পারিবারিক কলহে অভিমানে আত্মহত্যা করেন নূর হোসেনের ছেলে বিপ্লব হোসেন। তবে বিপ্লবকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে নূর হোসেন নিজেই- এ রকম অভিযোগ ছিল সিদ্ধিরগঞ্জের সর্বত্র। মৃত্যুর পর বিপ্লবের লাশ নূর হোসেনের নির্দেশে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়। ছেলের জানাজায় কমপক্ষে ২ থেকে ৩০০ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য উপস্থিত ছিলেন। লাশ নিয়ে যেন কোনো কথা না ওঠে এ লক্ষ্যেই লাশ উদ্ধারের পরে নূর হোসেনকে শেল্টার দেয় নারায়ণগঞ্জ র্যাব ও পুলিশ। জানা যায়, নূর হোসেনের মা বিপ্লবের মৃত্যু নিয়ে বলেছিলেন, নূরারে তুই কীভাবে ছেলেটাকে মারলি। এ নিয়ে নূর হোসেনের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে চরম ক্ষোভ ছিল। এদিকে, গতকাল চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের মাদক সাম্রাজ্য সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড় ট্রাকস্ট্যান্ডে হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও পাঁচটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে এ সময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। গতকাল বিকালে নূর হোসেনের মাদক সাম্রাজ্যে অভিযান চালিয়ে যখন পুলিশ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে সে সময় স্থানীয়রা বলছিল, এই মাদকের পাপে ছেলে মরেছিল, এবার বাপও মরবে।

জানা যায়, গত বছর ১০ নভেম্বর রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের এরশাদ শিকদার খ্যাত বিপ্লব নিজ বাড়িতে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্দহত্যা করেন। সে সময় চাউর হয়, মাদকাসক্ত ছেলে বিপ্লবকে সুস্থ করার নামে শাসনের অজুহাতে বিভিন্ন সময় নির্যাতন করে আসছে নূর হোসেন। সে দিন বিকালেও মারপিট করা হয়। হুমকি দেওয়া হয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর। এ কারণেই আত্দহত্যার পথ বেছে নেয় নূর হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী লিপির (তালাকপ্রাপ্ত) একমাত্র ছেলে বিপ্লব হোসেন। সে সময় পুলিশ সুপার নূরুল ইসলাম বলেছিলেন, গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বিপ্লব। তাকে নিয়ে পরিবারে অশান্তি ছিল। বিপ্লবের বিয়ে নিয়েও বিরোধ ছিল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নূর হোসেনের শিমরাইল টেকপাড়া বাড়ির মাত্র ৫০০ ফুট দূরত্বের মধ্যেই হাজি আজিম উদ্দিন পেট্রল পাম্প। এই পেট্রল পাম্পের গলিতেই রাত-দিন বিক্রি হয় জীবন ধ্বংসকারী সব ধরনের মাদক। এ মাদক স্পট পরিচালনাকারী শিমরাইল দক্ষিণপাড়ার সিদ্দিকের ছেলে সাইদুর নূর হোসেনের ছেলের জন্য এক সময় ফ্রি ফেনসিডিল নিয়ে যেত। এক পর্যায়ে নূর হোসেনের নির্দেশে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বিপ্লবকে কিনে খেতে হয় ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা। বিপ্লব ও তার ৫ সহযোগীর মাদক কেনার জন্য প্রতিদিন প্রয়োজন হতো অন্তত ৩০ হাজার টাকা। এ টাকার জন্য সম্পূর্ণ বেকারের এ দলকে প্রায়ই অপহরণসহ বিভিন্ন অপকর্মে নামতে হতো। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্নজনকে আটক করে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। 'অসীম ক্ষমতাধর' নূর কাউন্সিলরের ছেলে হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা দূরের কথা প্রতিবাদ করারও সাহস করত না। ফলে বাড়তেই থাকে অপরাধ কর্মকাণ্ড। ৪ দিনের ব্যবধানে শিমরাইল মোড় থেকে দুজনকে আটক করে দেড় লাখ টাকা আদায় করে বিপ্লব ও তার সহযোগীরা। ঘটনার দিন বিকাল ৪টায় শিমরাইল স্টিল ব্রিজ ও ঈদগাহ মাঠের পার্শ্ববর্তী গ্যারেজ থেকে বিপ্লব (নূর হোসেনের ছেলে), রুবেল (নূর হোসেনের বড় ভাই নূরুল হকের ছেলে), ফয়সাল (নূর হোসেনের বোনের ছেলে), শাহীন (নূর হোসেনের আরেক বড় ভাই নূরুল ইসলামের ছেলে) এবং আল আমীনকে (পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা নূর মোহাম্মদের ছেলে) ধরে আনে নূর হোসেনের লোকেরা। বাড়ির উঠানে ব্যাপক মারপিট করে নূর হোসেন। এরপর আপন বোনকে ডেকে ফয়সালকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেন, আরও শাসনের জন্য শাহীনকে তুলে দেয় বড় ভাইয়ের হাতে, আল আমীনকে ধরিয়ে দেয় পুলিশের কাছে। পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে বাঁচে রুবেল। আর বিপ্লবকে আটকে রেখে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে খবর দেয় তাকে নিয়ে যেতে। এ সময় মাদকাসক্ত কেন্দে যাবে না বলে আকুতি জানান বিপ্লব। এক পর্যায়ে নূর হোসেন গুলি করে মারতে উদ্যত হয় বিপ্লবকে। পরে নূর হোসেনকে শান্ত করে নিয়ে যায় তার মা। এরপরই বিছানার চাদর গলায় পেঁচিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে বিপ্লব। পরে তাকে সাজেদা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক সে সময় জানান, বিপ্লবের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিপ্লবের পরিবারের একাধিক সদস্য ও এলাকাবাসী জানান, এক সময় নম্র-ভদ্র আর আদর্শ হিসেবে এলাকায় স্বীকৃত ছিল বিপ্লবের নাম। লেখাপড়াও করে দার্জিলিংয়ে। এ সময়ই জড়িয়ে পড়ে নূর হোসেনের এক ভায়রা ভাইয়ের মেয়ের প্রেমে। পালিয়ে বিয়ে করে তারা। কিন্তু এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নূর হোসেন। মৃত্যুর ৩ বছর আগে জোর করে তাদের ডিভোর্স করায়। এ সময় স্ত্রীকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বিপ্লব। আসক্ত হয়ে পড়ে নেশায়। শুরু করে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও সিগারেট সেবন। তার সঙ্গে যোগ দেয় চাচাতো ও ফুফাতো ৩ ভাইসহ মোট ৫ মাদকসেবী।

বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার : এদিকে, গতকাল নূর হোসেনের মাদক সাম্রাজ্য সিদ্ধিরগঞ্জে শিমরাইল মোড় ট্রাকস্ট্যান্ডে হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও ৫টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে এ সময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। নূর হোসেনের এ মাদকের স্পটটি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি মাদকের আড়ত হিসেবে পরিচিত। সিদ্ধিরগঞ্জ ছাড়াও ডেমরা, সোনারগাঁওসহ আশপাশ এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা এ আড়ত থেকে মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করত। বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়ার্টার) মো. জাকারিয়ার নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় এএসপি জীবন কান্তি সরকারসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ উপস্থিত ছিল।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া জানান, নূর হোসেনের মাদক সাম্রাজ্যে বিপুল পরিমাণ মাদক মজুদ রয়েছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ হাজার ৯০০ বোতল ফেনসিডিল, ৯ বোতল বিদেশি মদ, বিপুলসংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩৭ কেস বিয়ার ও দুটি বড় ছোরা এবং ৩টি রামদা উদ্ধার করা হয়।

এদিকে অভিযানের সময় ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার আশপাশে উপস্থিত স্থানীয় লোকজন বলেন, পুলিশ এখন পর্যন্ত নূর হোসেনের কোনো হদিস বের করতে পারেনি। তাই সাধারণ মানুষ ও মিডিয়ার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতেই এমন উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন 

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.