বিমান বন্দর ষ্টেশন 
রফিকুল ইসলাম সাগর 
ভ্রমণের মাঝে লুকিয়ে থাকে নানা অভিজ্ঞতার কথা। অন্য সব যানবাহনে ভ্রমণের চেয়ে ট্রেন ভ্রমণের মজাটা সম্পূর্ণ আলাদা। দেশে এবং বিদেশে অসংখ্যবার ট্রেনে ভ্রমন করেছি। একেক দেশে ট্রেনের একেক নাম। আর ট্রেনের নাম গুলো মূলত ভিন্ন ভিন্ন দেশ অনুযায়ী তাদের স্থানীয় ভাষায়। 

আমার জীবনের ট্রেন ভ্রমণের স্মৃতি গুলো সব সময় মনে পড়ে যায়। ট্রেনের ঝক ঝক শব্দ, যানজট বিহীন পথ। ট্রেন লাইনের দু'পাশে সারি সারি গাছ, দেখা যায় আশে পাশে বাড়ি ঘর সব কিছুকে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে ট্রেন তার গন্তব্যে। ছোট বেলা থেকেই আমার ভ্রমণের নেশা। কোথাও ভ্রমনে যেতে ট্রেনকে বেছে নেই আমি সবার আগে। ট্রেন ভ্রমণের অসংখ্য অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে ঘটেছে অনেক ট্রেন দুর্ঘটনা। সময় মতো গন্তব্যে না পৌছানোর কারণে অনেক রাত কাটিয়েছি রেল স্টেশনে। এছাড়া ট্রেনের সময় সূচী বিলম্ব হওয়ার কারনেও ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়েছে রেল স্টেশনে।

কিছুক্ষণ পর পর চায়ের দোকানে গিয়ে চা পান করা, প্লাট ফর্মে বসে বসে অপেক্ষা করা, নানান রকমের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, নানান রকমের ঘটনা সেই মুহূর্ত গুলো ছিল আমার জীবনের ভালো কিছু মুহূর্ত। ট্রেন স্টেশন ও পার্শবর্তী দৃশ্য গুলো আমার চোখে খুব ভালো লাগে। সব স্টেশনের চেহারা একই রকম। তবে বিদেশী দেশের রেল স্টেশন গুলোতে আমাদের দেশের মতো চা স্টল নেই। এছাড়া সেসব রেল স্টেশন গুলো অনেক পরিস্কার পরিছন্ন। পাশাপাশি টিকেটিং সিস্টেম অনেক উন্নত। সব কিছু অটোমেটিক ইলেকট্রিক পদ্ধতি। যেকারণে বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণের কোনো সুযোগ নেই। রেলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বিনা টিকেটে রেল ভ্রমন প্রতিরোধ অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন জীবনের প্রথম স্কুল ফাকি দিয়ে দু'জন বন্ধু ট্রেনে করে চলে গিয়েছিলাম ঘোড়াশাল রেল স্টেশনে, তখন থেকে ট্রেন ভ্রমণের নেশা আমার বুকে বাসা বাধে। তারপর থেকে শুরু হলো আমার ট্রেন ভ্রমন। তখন থেকেই মূলত আমি ট্রেন ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে শুরু করি। তারপর থেকে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে যেতাম ট্রেনে করে। স্টেশনে গিয়ে সময় সূচী দেখতাম। স্টেশন পৌছানোর পর কাছিকাছি সময়ে যেই ট্রেন আসতো সেই ট্রেনেই উঠে পরতাম। এর আগেও ট্রেন ভ্রমন করেছি তবে বাবা-মায়ের সাথে। বলা যায় তখন তাদের প্রয়োজনে ট্রেন ভ্রমন করতাম। বাংলাদেশের প্রতিটি রেল স্টেশন আমার পরিচিত, প্রায় রেলের সব তথ্য আমার জানা। এমন অনেকবার হয়েছে, সকালের ট্রেনে যেতাম আবার রাতে আরেক ট্রেনে ফিরে আসতাম। মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধুই ট্রেনে চড়া। 

মালয়েশিয়ার চালকবিহীন ট্রেন 
রাতের ট্রেনে জানালার পাশে বসে মুহুর্তটা খুবই উপভোগ্য। মন আবেগী হয়ে যায়, অনেক ভাবনা-কল্পনা সৃষ্টি হয় হৃদয়ে। নিজের মনের সাথে নিজের কথা বলা। কবিতার ছন্দ সৃষ্টি করা। রাতের আধারে দূরের দৃশ্য গুলো ঠিক ভাবে দেখা যায় না, কল্পনায় আবিস্কার করতাম কী ঐখানে। ভ্রমনে গিয়ে পকেটের টাকা ফুরিয়ে গেলে বাড়ি ফেরা নিয়া ভয় পেতাম না। ট্রেনে টিকেট ছাড়া ও টাকা ছাড়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও অনেক আছে আমার। 

স্কুলে পড়াকালীন সময়ে আমি বাড়িতে কাউকে কিছু না বলে স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে দূর দুরান্তে চলে যেতাম। তখন ট্রেনের ছাদে বসে যেতে আমার বেশি ভালো লাগতো। তাই নির্দিষ্ট গৌন্তব্যের টিকেট কিনেও লোকাল ট্রেনের ছাদে বসে যেতাম। এখন আর ছাদে বসে যাওয়ার মতো পাগলামি করা হয়না। ট্রেনের ইঞ্জিন বগিতে চালকের সাথে বসে ট্রেন ভ্রমণের পাগলামিও মাঝে মাঝে করেছি। 

একটি ট্রেনের চালক আসন 
একটি ট্রেন যখন স্টেশন অথবা স্টেশনের বাইরে কোথাও থামে তখন ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে একেকজন যাত্রী একেক রকম মন্তব্য করে। ট্রেন কেন থামল, কখন আবার ছাড়বে এসব বিষয় নিয়ে। কোথাও যদি অতিরিক্ত সময় নিয়ে ট্রেন থেমে থাকে সবাই ট্রেন চালককে দোষারোপ করে। কিন্তু আমি দেখেছি এতে চালকের কোনো দোষ নেই। শুধুমাত্র চালকের বগিতে থাকলেই ট্রেন থামার সঠিক কারণ জানা যায়। এবং কখন ছাড়বে তাও জানা যায়। এসব ব্যাপারে সার্বক্ষণিক স্টেশন থেকে ওয়ারলেস ফোনের মাধ্যমে চালককে নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই নির্দেশনা এবং সিগনাল বাতি মেনেই চালক ট্রেন নিয়ে ছুটে চলেন ট্রেনে দুইজন চালক বসেন। একজন হেড চালক ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করে আরেকজন তাকে সহযোগিতা করেন। একটা অবাক করা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি চালক বগিতে বসে ভ্রমন করে, 'কিছু কিছু স্টেশনে ট্রেন না থেমে কম গতিতে চলতে থাকে। তখন ট্রেন স্টেশন অতিক্রম করার সময় প্লাটফর্মে একজন দাড়িয়ে থাকে যার হাতে একটি বড় লাঠি থাকে। লাঠির আগায় হালকা করে একটি কাগজ বাধা থাকে। যে কাগজটি চালকের জন্য। চলন্ত ট্রেন থেকে ইঞ্জিন বগির জানালা দিয়ে উকি দিয়ে সেই কাগজ সহযোগী চালক তার হাতে নেয়। এই কাগজে স্টেশন মাষ্টার দ্বারা চালকের জন্য কিছু নির্দেশনা লেখা থাকে।'

একবার আমি আর আমার এক বড় ভাই কুলাউড়া যাওয়ার পথে নরসিংদী রেল স্টেশনের কাছে রেল দুর্ঘটনার শিকার হই। যে কারণে ট্রেনটি নির্দিষ্ট সময়ের পাচ ঘন্টা পর কুলাউড়া রেল স্টেশনে পৌছে। পরের দিন বাড়ি ফেরার পথে পকেটে স্বল্প পরিমান টাকা। মধ্য রাতে বেছে নিলাম একটি লোকাল ট্রেন। বাড়ি ফেরার জন্য উঠে বসলাম লোকাল ট্রেনে। কুলাউড়া স্টেশন থেকে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়লো দেড় ঘন্টা পর। মনে মনে ধারণা করে নিলাম এই ট্রেন পৌছাতে কমপক্ষে দু'দিন লাগবে। লাগলে লাগুক না এই বলে মনকে সান্তনা দিলাম। প্রতিটা স্টেশনে থামতে থামতে পরদিন বিকাল ৪ টায় ট্রেনটি ঢাকা বিমান বন্দর রেল স্টেশনে পৌছেছিল। ট্রেন ভ্রমনে বাধা এসেছে অনেক তার পরেও বন্ধ হয়নি ট্রেন ভ্রমন। 
লেখা ও ছবি: রফিকুল ইসলাম সাগর 

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.