(সাপ্তাহিক ‘সাপ্তাহিক’) - ভোটার সংখ্যার হিসাবে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নির্বাচন হচ্ছে ভারতে। প্রায় ৮১ কোটি ভোটার অংশ নিচ্ছেন ভারতের জাতীয় সংসদ লোকসভা নির্বাচনে। পরপর দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ (সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা) জোটের সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে পাল্লা দিচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (এনডিএ)। ভারতের পুরনো এবং সর্বভারতীয় দল কংগ্রেসকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে অত্যন্ত শক্ত প্রতিপক্ষ বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার নরেন্দ্র মোদিকে। কংগ্রেস বনাম মোদি লড়াইয়ে ক্রমশ ‘মোদি ওয়েভ’ যে প্রতিপত্তি দেখাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির ক্ষমতায় আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কংগ্রেস গত এক দশক ধরে রাহুল গান্ধীকে আইকন হিসেবে সামনে এনে এই ভোটযুদ্ধে লড়তে চেয়েছে। গান্ধী ডাইনাস্টির উত্তরাধিকার নিয়ে ‘রাহুল কার্ড’ ছিল কংগ্রেসের নির্বাচনী নিশানা। কিন্তু নয় ধাপের এই নির্বাচন যত শেষের দিকে যাচ্ছে, প্রচারণার পাদপ্রদীপে ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। ‘মোদিট্রিক্স’ প্রায় ধরাশায়ী করে ফেলেছে রাহুল গান্ধীর একক ইমেজ ব্যবহারের চেষ্টাকে। কংগ্রেস সে ধাক্কা সামলাতে মাঠে নামিয়েছে সোনিয়া গান্ধী, প্রিয়াংকা গান্ধীকে।
কিন্তু গত এক দশকের তৈরি করা কংগ্রেসের ‘রাহুল কার্ড’ কেন মোদিঝড়ে এলোমেলো? মোদির ‘গুজরাট মডেল’ কেন কাবু করে ফেলছে কংগ্রেসের সকল উন্নয়ন প্রচারণাকে? সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অভিযুক্ত, মৌলবাদী বিজেপির নেতা নরেন্দ্র মোদি গোটা বিজেপির প্রচারণাকে নিজের নামে চালিয়ে ভারতজুড়ে এক রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী গণজোয়ার কীভাবে তুললেন?
ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বলে পরিচিত রাহুল গান্ধী এবং তার দল ভারতীয় কংগ্রেস কেন মানুষের মনে জায়গা হারাল? ‘হর হর মোদি, ঘর ঘর মোদি’ সেøাগান তুলে চায়ের দোকানের এক সময়ের শ্রমিক, টি-বয় নরেন্দ্র মোদি কী করে সোনার চামচ মুখে জন্ম নেয়া রাজপরিবারের হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড পড়–য়া রাহুল গান্ধীকে ক্রমশ ম্রিয়মাণ করে তুললেন ভোটের প্রচারণার এই উত্তুঙ্গ লড়াইয়ে? বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনের এই হাওয়াবদল বিশ্লেষণ করেছেন শুভ কিবরিয়া
রাহুলের রাজনীতি
রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সহ-সভাপতির দায়িত্ব নেন ২০১৩ সালে, যখন তার বয়স ৪৩ বছর। ২০০৪ সালে বাবার আসন আমেথিতে এমপি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়েই রাহুল গান্ধীর রাজনীতিতে আগমন। ৩৪ বছর বয়সে রাজনীতিতে পা দিয়েই এমপি। ৩৭ বছরে ভারতীয় যুব কংগ্রেস, ভারতীয় ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পান। ২০০৭ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। ৩৭ বছর বয়সে একাধারে যুব কংগ্রেস, স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ থেকে ২০১৩ এই অর্ধযুগ রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের মূল সংগঠন ও ছাত্র-যুব সংগঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন। ২০০৯ সালে কংগ্রেস সরকার গঠন করলে মন্ত্রী হওয়ার কথা ওঠে। মা সোনিয়া গান্ধীর মতো তিনিও সরকারি দায়িত্ব না নিয়ে সংগঠনের দায়িত্ব নেন। দলকে সুসংগঠিত করতে প্রচেষ্টা চালান। যেসব রাজ্যে কংগ্রেস নির্বাচনে খারাপ ফল করে সেখানে সংগঠনের শ্রীবৃদ্ধি অর্জনে, জনগণের মন পাওয়ার চেষ্টা করেন। দলের অভ্যন্তরে তরুণদের নিয়ে নতুন ঘরানার কংগ্রেসের রাজনীতি তৈরির চেষ্টা চালান। রাহুলের এই রাজনৈতিক প্রচেষ্টা দলে, দলের বাইরে কংগ্রেসের নয়ানেতা হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। সোনিয়া গান্ধী দলের সভাপতি এবং ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাহুলকে প্রতিষ্ঠার একটা প্রত্যক্ষ চেষ্টা চালান। রাহুল গান্ধী নিচ থেকে ওপরে দলকে সংস্কারের মনোবাসনা প্রকাশ করতে থাকেন।
রাহুল গান্ধীর চিন্তানুযায়ী ১শ ১২ কোটি লোকের ভারতের রাজনীতি তিন স্তরে চলে। মধ্যম স্তরে প্রায় ৪ হাজার লোক এবং একদম উপরে প্রায় ৪শ লোক গোটা ভারতের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। ১.২ বিলিয়ন লোকের ভবিষ্যৎ এই ৪ হাজার-সাড়ে ৪ হাজার লোকের ওপর নির্ভরশীল। এই পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করে তৃণমূল থেকে ক্রমশ ওপরের দিকে নেতা নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরুর চেষ্টা করেন। দলের মধ্যে এই সংস্কার প্রচেষ্টা খুব দ্রুতই ব্যর্থ হয়। ভারতীয় রাজনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের ভালো ফলাফলের জন্য রাহুল জান লড়িয়ে দেন। সেখানেও বিধানসভা নির্বাচনে রাহুলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ‘গরিবী হটাও’ সেøাগান নিয়ে রাহুল গান্ধী যে নতুন রাজনীতির চেষ্টা শুরু করেন, তা সাফল্য পায়নি। তারপরও গান্ধী ডাইনাস্টির কল্যাণে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে ২০১৩ সালে ৪৩ বছর বয়সে রাহুল গান্ধীকে কংগ্রেসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ সহ-সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ২০০৪ সালে রাজনীতিতে পা রেখে ২০১৩ সালে মাত্র নয় বছরেই রাহুল গান্ধী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ার সুবাদে দলের দ্বিতীয় শীর্ষ পদে আরোহণ করেন।
খ.
রাহুল গান্ধীর গত নয় বছরের রাজনৈতিক জীবনে বড় কোনো সাফল্য আসেনি। কংগ্রেস সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া, জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে না পারা, মুদ্রাস্ফীতি রোধ করতে না পারা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে না পারা এবং বিশেষত বড় বড় দুর্নীতি ঠেকাতে কার্যকর অবস্থান না নেয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব ক্ষেত্রে দলের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে এবং গান্ধী ডাইনাস্টির উত্তরাধিকার হিসেবে রাহুল গান্ধীর কোনো উজ্জ্বল ভূমিকা দৃশ্যমান হয়নি। রাহুল গান্ধীর প্রতি যে প্রত্যাশা ২০০৯ সালের পর থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল, সেই ক্যারিশমা দেখাতে ব্যর্থ হন রাহুল গান্ধী। ক্রমশ প্রতিপক্ষরা তাকে মেধাহীন, প্রতিভাহীন, ভবিষ্যৎ লক্ষ্যহীন, আত্মবিশ্বাসহীন ব্যক্তি হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে। এবারের নির্বাচনে দলের ভাবী প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবেও কংগ্রেস তাকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করায় সেই সমালোচনা আরও বাড়তে থাকে। ফলে কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড বা ভারতীয় রাজনীতির পেছনে পৃষ্ঠপোষকতাকারী শিল্পগোষ্ঠী রাহুল গান্ধীর চাইতে নরেন্দ্র মোদির প্রতি ঝুঁকতে শুরু করে।
গ.
রাহুল গান্ধী সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন। রাজনীতিতে তার জন্য সর্বোচ্চ আসন সবসময় খোলা ছিল। দলের বড় পদে যেতে তাকে কোনো লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়নি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি মন্ত্রী হননি। দেশ চালানোর প্রত্যক্ষ কোনো অভিজ্ঞতা অর্জনের দৃশ্যমান চেষ্টা সবসময় এড়িয়ে গেছেন মন্ত্রিত্ব না নিয়ে। আবার ব্যক্তিগত জীবনে রাহুলের কোনো ক্যারিশম্যাটিক ক্যারিয়ার দেখা যায়নি।
১৪ বছর বয়সে দাদি ইন্দিরা গান্ধী, ২১ বছর বয়সে বাবা রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড তাকে দেখতে হয়েছে। একসময় ধর্মান্ধ শিখগোষ্ঠী, আরেক সময় ভয়ঙ্কর তামিল টাইগার গোষ্ঠীর ভয় তাকে তাড়া করেছে। নিরাপত্তার অভাবে তাকে এক স্কুল থেকে আরেক স্কুলে সরতে হয়েছে। এমনকি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯-এ ছয় বছর কোনো স্কুলে যেতে পারেননি রাহুল গান্ধী। নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘরেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। পরবর্তীতে হার্ভার্ডে পড়তে গেলেও পরিচয় গোপন রেখে পড়াশোনা চালাতে হয়েছে। রাহুল গান্ধী ১৯৯৪ সালে ফ্লোরিডার রোলিনস কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯৯৫ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজ থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে এম.ফিল ডিগ্রি নেন। সবসময় নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিয়ে একটা নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই বড় হতে হয়েছে রাহুল গান্ধীকে।
মোদির রাজনীতি
ভাদনগর একসময় বোম্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মেহসানা জেলার ভাদনগর এখন গুজরাট রাজ্যের মধ্যে। ভাদনগর থেকেই লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি। উত্তর প্রদেশের বারানসি আসনেও তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। কেননা উত্তর প্রদেশে বিজেপির ‘মোদিঝড়’ তোলাটা খুব জরুরি। উত্তর প্রদেশে লোকসভার আসন ৮০টি। ভারতের অধিকাংশ প্রধানমন্ত্রী এসেছেন উত্তর প্রদেশ থেকে। গান্ধী পরিবারের সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী এবার লড়ছেন উত্তর প্রদেশের রায়বেরিলি আর আমেথি আসনে। একসময় এই দুই আসনে ভোটে জিতেছেন ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী- ভারতের দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। সেই উত্তর প্রদেশ শুধু নয়, ভারতজুড়ে যে এক ব্যক্তির নামে ভোট চেয়ে প্রচারণা চলছে, গোটা বিজেপির নির্বাচনী প্রচার যে নামে এসে ঠেকেছে, সেই ‘মোদি ওয়েভ’-এর জনক নরেন্দ্র মোদির জন্ম ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। বাবা দামোদার দাস মুলচন্দ মোদি, মা হীরাবেন । গুজরাটের ভাদনগরেই বেড়ে উঠেছেন মোদি। বাবা-মা’র ছয় সন্তানের মধ্যে তৃতীয় মোদির শৈশব-কৈশোর কেটেছে চা বিক্রির দোকানের কর্মী হিসেবে। ভাদনগর রেলস্টেশনে বাবার চায়ের দোকানে চা বিক্রির কাজে হাত লাগাতেন ছোটবেলায়। পরে পাশের বাস টার্মিনালে ভাইয়ের সঙ্গে মিলে চালাতেন চায়ের দোকান। চা বিক্রেতা মোদির প্রাথমিক স্কুল শিক্ষা ভাদনগরে। মোদি খুব বিখ্যাত হওয়ার পরও তার স্কুল শিক্ষকরা স্বীকার করেননি ক্লাসে খুব দৃষ্টিকাড়া ছাত্র ছিলেন মোদি। সাধারণ আর দশটা গরিব পরিবারের সন্তানের মতোই গড়পড়তা ছাত্র ছিলেন স্কুলে। কিন্তু তার আগ্রহ ছিল থিয়েটারে। ভালো বিতর্কও করতে পারতেন মোদি।
খ.
মোদির বয়স যখন ৮ বছর তখন সংস্পর্শে আসেন ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর। নাগপুরে সংঘ পরিবারের ট্রেনিং সেন্টারে ট্রেনিং নিয়েছেন। চা বিক্রির পাশাপাশি চলেছে কট্টর হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন আরএসএস-এর সঙ্গে ওঠাবসা। সংগঠন গড়ে তোলার প্রতি তার নিষ্ঠা, সংগঠনের প্রতি আগ্রহ, প্রচারণার কাজে মগ্নতা ছিল চোখে পড়ার মতো। একসময় সংঘ পরিবারের ছাত্র ইউনিয়ন ‘অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদ’ গুজরাট শাখার দায়িত্ব এসে যায়। গুজরাট শাখা, অখিল ভারত বিদ্যার্থী পরিষদ সংগঠনে মোদি সাফল্য দেখান। মৌলবাদী সংগঠনের প্রতি তার একনিষ্ঠ মনোযোগ, অবিরাম শ্রম সবার দৃষ্টি কাড়ে। এর মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যান মোদি। গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান (পলিটিক্যাল সায়েন্স) বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। মোদির বয়স যখন ২০ বছর, তখন তিনি আরএসএস নামে কট্টর হিন্দু মৌলবাদী সংগঠনের ফুলটাইম প্রচারক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। যে কোনো সাংগঠনিক আয়োজন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিবিষ্টভাবে পরিপূর্ণ আত্মনিয়োগ মোদিকে ভবিষ্যতের মোদি হিসেবে তৈরিতে বিশেষভাবে সহায়তা করে। আরও ১৫ বছর পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (জধংযঃৎরুধ ঝধিুধসংবাধশ ঝধহময-জঝঝ) ফুলটাইম প্রচারক মোদির জায়গা মেলে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গুজরাট শাখায়। ১৯৮৫ সালে ৩৫ বছর বয়সে বিজেপির রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। খুব দ্রুতই তার সাংগঠনিক দক্ষতা, জনগণকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা, জনতুষ্টি আনা বক্তৃতা বিজেপির সংগঠনে প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়।
গ.
গুজরাট বিজেপির রাজনীতিতে মোদির গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। মুরলি মনোহর যোশি সে সময় কেন্দ্রীয় নেতা। তার উদ্যোগে আয়োজিত হয় ‘একতা যাত্রা’, অনেকটা লংমার্চ ধরনের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। সেখানে নরেন্দ্র মোদি অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হন। মোদির রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে উত্থানপর্ব শুরু হয় সেখান থেকেই। ১৯৮৮ সালে গুজরাট রাজ্য শাখা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৯৫ সালে গুজরাট রাজ্যসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের মূল নায়ক ছিলেন তিনি। এসব সাফল্য তাকে রাজনীতির ভবিষ্যৎ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করার পথে ঠেলে দেয়। ১৯৯৫ সালে বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হন। ১৯৯৮ সালে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে জায়গা মেলে তার। হরিয়ানা এবং হিমাচল প্রদেশে বিজেপি সংগঠনকে চাঙ্গা করা, স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফলাফল করার জন্য সংগঠকের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। ১৯৯৮ সালে গুজরাট বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপির ভালো ফল লাভ হয় মোদির রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজির সাফল্যের কারণেই। গুজরাটে টানা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এবারের নির্বাচনে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য লড়ছেন।
আলোচিত গুজরাট মডেল
‘মোদিঝড়’ এত বিকাচ্ছে কেন? ভারতীয় মিডিয়াজুড়ে মোদিকে নিয়ে এত মাতামাতি কেন? কেউ কেউ বলছেন করপোরেট দুনিয়া পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে। কিন্তু, করপোরেট দুনিয়ার এই মোদিপ্রেম কেন? কেন তারা মোদিকে ব্যবসাপ্রিয় নেতা হিসেবে, জনগণের সামনে তুলে ধরতে এরকম প্রচারণা চালাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে মোদির গত প্রায় দেড় দশকের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর জীবন পর্যালোচনা করলে। মোদি বলছেন তার ‘গুজরাট মডেল’ তিনি ছড়িয়ে দেবেন ভারতজুড়ে। তিনি স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, তার ‘গুজরাট মডেল’ উন্নয়ন ও সুশাসনের যে সুফল পাচ্ছে গুজরাটের মানুষ, বিজেপি জিতলে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে সেই সুফল পাবে গোটা ভারতের মানুষ।
এখন দেখা যাক ‘গুজরাট মডেল’ উন্নয়ন কী এনেছে?
এক. ২০০১-০২ সালে গুজরাটে মাথাপিছু আয় যা ছিল, ২০১১-১২ সালে তা বেড়েছে ১৫.৬%। যা ভারতের যে কোনো রাজ্যের চেয়ে বেশি।
দুই. ২০১২ সালের তথ্যানুযায়ী গুজরাটে বেকারের সংখ্যা মাত্র ১%। ভারতের যে কোনো রাজ্যের তুলনায় তা সর্বনিম্ন।
তিন. ভারতের কোনো রাজ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু গুজরাটে মোদি তা করে দেখিয়েছেন। ১০০% বিদ্যুতায়নই করেননি, সেচ ও আবাসিক বিদ্যুতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফিডার লাইন ব্যবহার করেছেন। যাতে সেচ গ্রাহকরা ন্যূনতম ৮ ঘণ্টা নির্বিঘœ বিদ্যুৎ পায়।
চার. ২০০২-০৩ থেকে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার, জিডিপি গ্রোথ ১০% অব্যাহত আছে।
পাঁচ. সবার জন্য সড়ক, বিদ্যুৎ এবং পানি- এই স্লোগান নিয়ে এই তিনখাতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। কৃষিতে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটেছে। গুজরাটের ১৮ হাজার গ্রামে বিদ্যুতায়ন ঘটেছে। ২০০১ থেকে ২০১০ হিসাব নিলে ভারতের মধ্যে কৃষিতে সর্বোচ্চ উৎপাদন বেড়েছে গুজরাটে। প্রায় ১১ শতাংশ।
ছয়. মোদি তার উন্নয়ন মডেলে কিছু নতুন নতুন আইডিয়ার বাস্তবায়ন করেছেন। তার একটি জঁৎনধহরংধঃরড়হ. গ্রাম থেকে যাতে মানুষ শহরে আসতে না চায়, সেজন্য গ্রামেই শহরের সুবিধাদি তৈরি করেছেন। গ্রামে অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সুবিধাদির রূপান্তর এই প্রজেক্টকে যথেষ্ট সাফল্য দিয়েছে।
সাত. মোদি যে খাতে সবচেয়ে বেশি সাফল্য দাবি করেন তা হচ্ছে শিল্পায়ন। ২০০১-০৪ সালে গুজরাটে শিল্পায়ন প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৩.৯৫ শতাংশ, ২০০৫-০৯ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১২.৬৫%-এ। শিল্পায়নের প্রাথমিক শর্ত অবকাঠামো, জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ তিনি সহজলভ্য করেছেন শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য। কম দামে জমি দিয়ে বড় বড় শিল্প প্যাকেজ করেছেন। শিল্পায়নের জন্য রাষ্ট্র থেকে সাবসিডি দিয়েছেন। ফলে কলকাতা থেকে টাটার ন্যানো প্রকল্প উঠে গিয়ে গুজরাটে সফল হয়েছে। রিলায়েন্স, এসার (ঊংংধৎ), টাটা মোটরস গুজরাটে তাদের বৃহৎ শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে। শিল্পপ্রীতি মোদি মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যদিও সমালোচকদের ভাষায় মোদি কম দামে জমি তুলে দিচ্ছেন প্রাইভেট শিল্পোদ্যোক্তাদের হাতে।
আট. গুজরাট মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ই-গভর্নেন্স। ফলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ সহজতর হয়েছে। মোদির ভাষায় জনগণ সরকারের কাছে আসবে না, সরকারই জনগণের দোরগোড়ায় হাজির হবে। গুজরাটের ১৮ হাজার গ্রামেই বছরের তিন দিন রাজ্যের প্রশাসন কর্তাদের হাজির থাকতে হয়। স্থানীয় জনগণের কথা শুনতে হয়। ১৮ হাজার গ্রামের মধ্যে ১৩ হাজার ৭শ গ্রামে ব্রডব্যান্ড কানেকশন আছে। অনলাইনে খোদ প্রধানমন্ত্রী গ্রামের মানুষের সমস্যা শুনে সমাধান করার জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প বহাল রেখেছেন। প্রতি মাসের চতুর্থ শনিবার ঘণ্টা চারেক অনলাইনে মোদি নিজে সময় দেন। Swagat Online Grievance Redressal System নামে এই প্রকল্পটি মুখ্যমন্ত্রীর অফিস পরিচালনা করে।
কেন মোদি, রাহুল না
নির্বাচনী প্রচারণায় রাহুল গান্ধীর ইমেজ ব্যবহার করতে চেয়েছিল কংগ্রেস। নির্বাচনের আগে মিডিয়ার প্রচারণায় রাহুল ছিলেন শীর্ষে। কিন্তু ক্রমশ সেই প্রচারণা চাপা পড়ে নরেন্দ্র মোদির ‘মোদি ওয়েভ’-এ। গুজরাট থেকে দিল্লির কেন্দ্রে আলোচনা ও প্রচারণার শীর্ষে চলে আসেন নরেন্দ্র মোদি। বিজেপির সামষ্টিক রাজনীতিকে ছাপিয়ে মোদিই হয়ে ওঠেন দলীয় প্রতীক পদ্মফুলের সমার্থক। নরেন্দ্র মোদির এই উত্থান কেন, কেন রাহুলের এই মিইয়ে যাওয়া-
এক. বিজেপি নিজেদের মধ্যে সকল বিতর্ক সত্ত্বেও নির্বাচনে দল জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, জনগণের কাছে সেই সুস্পষ্ট বার্তা দিতে পেরেছে। নরেন্দ্র মোদিকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণার পর বিজেপি নির্বাচনে জনগণকে এই বার্তা দিয়েছে, তারা কার ওপর দেশ চালানোর দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেস জিতলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা সুস্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয় কংগ্রেস। রাহুল গান্ধীর ইমেজ ব্যবহার করে কংগ্রেস নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে চায় কিন্তু কংগ্রেস জিতলে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা, তা সুস্পষ্ট করেনি কংগ্রেস। কংগ্রেসের এই দোদুল্যমানতাই নির্বাচনী ইমেজে রাহুল গান্ধীকে ক্রমশ পিছনে ঠেলেছে।
দুই. দুর্নীতি ভারতীয় রাজনীতির সবচাইতে বড় এজেন্ডা। কংগ্রেসের গত পাঁচ বছরের শাসনে বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল হয়েছে ভারত। আন্না হাজারে, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো দুর্নীতিবিরোধী ব্যক্তির উত্থান ঘটেছে। আম আদমি পার্টির জন্ম হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের ময়দানে। ‘দুর্নীতি ইস্যু’ সমাধানে কংগ্রেস এবং গান্ধী পরিবার কোনো ক্যারিশম্যাটিক সমাধান আনতে পারেনি। রাহুল গান্ধী এক্ষেত্রে বড় কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি। এক্ষেত্রে গুজরাট মডেলে নরেন্দ্র মোদির দুর্নীতিবিরোধী লড়াই জনমনে আস্থা দিয়েছে। মানুষ ভেবেছে গুজরাটে কথিত সুশাসন মডেল ভারতব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারবেন নরেন্দ্র মোদি।
তিন. রাহুল গান্ধী উপর থেকে এসে দলের বড় পদে বসেছেন পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে। দাদি ও বাবার তৈরি আসনে এসে বসে নেতা হয়েছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদি অখ্যাত এক পরিবার থেকে এসে, টি-বয়ের জীবন থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদি হয়েছেন নিজ গুণে। নিজ যোগ্যতার বলে গুজরাটে টানা তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হয়েছেন সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতাবলে। মোদির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তির কাছে গৌণ হয়ে উঠেছেন গান্ধী পরিবারের সুযোগ নেয়া রাহুল গান্ধী।
চার. নির্বাচনে ধর্ম ও হিন্দুত্ববাদকে সজোরে, উন্নয়নের রং ছড়িয়ে ব্যবহার করতে পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপি। ভারতীয় সমাজে, তৃণমূলে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে হিন্দুত্ববাদ প্রবলতর জায়গা নিয়ে আছে। সমাজের ওপরতলায় সংস্কৃতির মোড়কে হিন্দুত্ববাদের খুবই সবলতর একটি জায়গা আছে। নরেন্দ্র মোদি হিন্দুত্ববাদকে উন্নয়নের মোড়কে জাতীয়তাবাদী চেতনার রঙে জাগিয়ে সমাজের ওপরতলা, মধ্যতলা ও তৃণমূলে নির্বাচনী প্রচারণার ঢেউ তুলেছেন। এর বিপরীতে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার মৃদুস্বরে হারিয়ে গেছে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসি জোশ।
পাঁচ. ড. মনমোহন সিং দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খুব আস্থাভাজন, শক্তিমান শাসক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেননি। ভারতীয় শিল্পসমাজ, ব্যবসায়ী মহল, আমলাতন্ত্র চায় মাথার ওপর একজন শক্তিমান শাসক। রাহুল গান্ধীর মধ্যে সেই তেজ ও অভিজ্ঞতা দৃশ্যমান নয়। কংগ্রেসের অপরাপর নেতাদের মধ্যেও সেরকম উজ্জ্বল কাউকে দেখা যায় না। এক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি খুবই উজ্জ্বলতর জায়গা করে ফেলেছেন। ২০০২-এ গুজরাটে দাঙ্গার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছাড়া তার বিরুদ্ধে আর কোনো বড় অভিযোগ দায়ের করতে পারেনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। আদালতে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তা-ও ধোপে টিকছে না।

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.