প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন ও অল্প অল্প প্রস্রাব, প্রস্রাব করার পরও ইচ্ছা থাকা, তলপেট ও কোমরের পেছনে দুই পাশে ব্যথা, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, প্রস্রাব দুর্গন্ধযুক্ত, ঘোলা কখনও রক্তমাখা ইত্যাদি প্রস্রাবের প্রদাহের প্রধান লক্ষণ।
মেয়েরা সাধারণত যতদিন পর্যন্ত প্রজননক্ষম থাকে ততদিন তাদের কিডনি রোগ পুরুষের তুলনায় কম হয়। তবে কতগুলো ক্ষেত্রে মেয়েরা কিডনি রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন গর্ভবতীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া, একলাম্পসিয়া, গর্ভপাতজনিত কিডনি ফেইলিওর, প্রস্রাবে প্রদাহ, পূর্ববর্তী কিডনি রোগ হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠা ও অপারেশনজনিত কিডনি ফেইলিওরে তারা আক্রান্ত হতে পারে। তা ছাড়া মেয়েদের প্রস্রাবে ইনফেকশন ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি হয়। বাতজনিত রোগ থেকে কিডনি আক্রমণ যেমন Systmic Lupus Erythematous মেয়েদে ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় ৯ গুণ বেশি হয়ে থাকে।
গর্ভবতীর উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি বিকল
গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ কমে যায়। ডায়াসটলিক প্রেসার ১০-১৫ এবং সিসটোলিক ১৫-২৫ মিলি নেমে আসে। গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ আগের মতো থাকলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। ডায়াসটলিক প্রেসার যদি ৯০ মি.মি. এর উপরে থাকে তবে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা করতে হবে। গর্ভাবস্থায় মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ চার ভাগে ভাগ করা যায়। প্রি-একলাম্পসিয়া, একলাম্পসিয়া, কিডনিসংক্রান্ত উচ্চ রক্তচাপ এবং আগে থেকেই থাকা উচ্চ রক্তচাপ।
প্রি-একলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়া
যেসব গর্ভবতীর গর্ভধারণের পর প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার ২০ সপ্তাহ পর হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়, প্রস্রাব থেকে অ্যালবুমিন নির্গত হয়, রক্তে অ্যালবুমিন কমে আসে- এ অবস্থাকে প্রি-একলাম্পসিয়া বলা হয়। দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ না করলে রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে গিয়ে মা ও সন্তানের ক্ষতি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এমনকি কিডনি ফেইলিওরও হতে পারে। প্রি-একলাম্পমিয়ার সঙ্গে যদি খিচুনি দেখা যায় তবে তাকে একলাম্পসিয়া বলে। এটি গর্ভবতী মায়ের জন্য জরুরি অবস্থা। স্ত্রী রোগ ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এর চিকিৎসা করতে হবে। প্রয়োজনে মায়ের জীবন রক্ষার্থে গর্ভপাত ঘটাতে হবে, নয়তো সময়ের আগেই বাচ্চা ডেলিভারি করাতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এ যাত্রায় সুস্থ হয়ে গেলেও ভবিষ্যতে এ মায়েদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন যেতে থাকলে ভবিষ্যতে কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই প্রি-একশলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়ার রোগীদের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে থাকা উচিত।
পূর্ব থেকে কিডনি রোগ থাকলে গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি বেশি
যাদের বিভিন্ন ধরনের নেফ্রাইটিস আছে বা যারা ধীরগতিতে বা ক্রনিক কিডনি রোগে ভুগছেন তাদের গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মায়েদের চেয়ে অনেক বেশি। গর্ভবতী অবস্থায় পূর্ববর্তী কিডনি রোগ থেকে জটিলতা বেড়ে যেতে পারে। আবার কিডনির ওষুধ সেবনের জন্য বাচ্চার ক্ষতিসাধন হতে পারে। এক্ষেত্রে গর্ভপাত হতে পারে। আগে থেকে কারও কিডনি রোগ থাকলে তা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক গর্ভধারণ করতে পারেন। কারও যদি বাতজাতীয় কিডনি রোগ থাকে তবে এর চিকিৎসা করে কমপক্ষে ৬ মাস রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকার পর কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মোতাবেক গর্ভধারণ করতে পারেন। যদিও এতে ঝুঁকি থেকেই থাকে।
বংশগত উচ্চ রক্তচাপ বা এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন
যাদের আগে থেকে উচ্চ রক্তচাপ ছিল গর্ভাবস্থায় তা বেড়ে যেতে পারে তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে অনেক ওষুধ আছে যা ভ্রুণের জন্য ক্ষতিকারক। কাজেই ইচ্ছেমতো প্রেসারের ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। মিথাইল ডোপা, ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার ও কিছু বিটা ব্লকার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ, এসিই ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ শিশুর ক্ষতি করতে পারে। মেয়েদের প্রস্রাবের নালীর মুখ, প্রজনন অঙ্গ ও পয়ঃনালী খুব কাছাকাছি। জীবাণু সহজেই এসব স্থান থেকে প্রস্রাবের রাস্তায় সংক্রমিত হতে পারে।
নববিবাহিত মেয়েদের প্রস্রাবে ইনফেকশন বেশি হয়। একে বলা হয় ‘হানিমুন সিসটাইটিস’। অনেক সময় কারও জরায়ু নিচে নেমে আসে, প্রস্রাব করার পরও থলিতে প্রস্রাব থেকে যায়। প্রশিক্ষণহীন দাইয়ের মাধ্যমে যে মায়ের ডেলিভারি করানো হয়েছে, তাদের প্রস্রাবের প্রদাহ বেশি হয়।
কারও যদি প্রস্রাবে প্রদাহ সন্দেহ করা হয় তাহলে প্রস্রাব ল্যাব টেস্টের জন্য কালচার না পাঠিয়ে কখনও জীবানুনাশক ওষুধ খাবেন না। এতে কোন জাতীয় জীবাণু দ্বারা ইনফেকশন হয়েছে এবং কোন ওষুধ কাজ করবে তা নির্ধারণে মারাÍক সমস্যা হতে পারে।
গর্ভপাতজনিত জটিলতার কারণে আকস্মিক কিডনি ফেইলিওরের অনেক রোগী আছে। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় গ্রামের দাইদের মাধ্যমে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে গর্ভপাত ঘটানো হয়। এর ফলে জরায়ুতে ইনফেকশন হয়, এটি রক্তে ছড়িয়ে যায় এবং সেপটিসিমিয়া হয়ে কিডনি ফেইলিওর হয়। এর উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে মৃত্যু অনিবার্য। তাই কোনোক্রমেই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানো উচিত নয়। 
অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ
চিফ কনসালটেন্ট এবং বিভাগীয় প্রধান
কিডনি রোগ বিভাগ, ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
বিভাগ:

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.