(সাপ্তাহিক ‘সাপ্তাহিক’)) - লিখেছেন- আনিস রায়হান
রানা প্লাজার শ্রমিকদের সাহায্য দেয়ার জন্য জনগণ যে অর্থ বিভিন্ন তহবিলে দিয়েছেন, সেই টাকাও শ্রমিকদের দেয়া হচ্ছে না। শ্রমিকদের মালিকরা এখনও মানুষ ভাবতে পারছেন না বলেই এই আচরণ। শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং সহযোগিতার বিষয়টিকে অনেকেই গুলিয়ে ফেলছেন। রানা প্লাজা ধসের পর ঢাকা ও এর আশেপাশের সাধারণ মানুষ ছুটে গিয়েছেন ঘটনাস্থলে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি আহতদের ওষুধ, অর্থ সহযোগিতাসহ যে যা পেরেছেন তাই দিয়েছেন। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এবং দেশের বাইরে থেকেও অনেকে অর্থ পাঠিয়েছেন শ্রমিকদের সহযোগিতা দেয়ার জন্য।
প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোই এজন্য ১১০ কোটি টাকার সহযোগিতা দিয়েছেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেয়া হয় আরও ১৭ কোটি টাকা। শুধু প্রধানমন্ত্রীর তহবিলেই মোট ১২৭ কোটি ৬৭ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪৯ টাকা জনগণের পক্ষ থেকে সহযোগিতার জন্য দেয়া হয়েছে। ১৭ এপ্রিল, ২০১৪ পর্যন্ত এ তহবিল থেকে মাত্র ২২ কোটি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭২০ টাকা ব্যয় হয়েছে। বাকি প্রায় ১০৫ কোটি টাকা এখনও তহবিলে অলস পড়ে আছে।
গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ রানা প্লাজা ধসের পর একটি দুর্যোগ মোকাবেলা তহবিল গঠন করে। সেই তহবিলে কত টাকা জমা হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। তবে বিজিএমইএ তার প্রত্যেক সদস্যকে ওই তহবিলে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা করে জমা দিতে বলেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রানা প্লাজা ধসের পাঁচ মাসের মাথায় প্রকাশিত এক খবরে বিজিএমইএ সভাপতির বরাতে বলা হয় যে, তহবিলটিতে ৫ হাজার ৪০০ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১৮৪২ জন মিলে মোট ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা দেয়। যার মধ্যে এক কোটি টাকা আবার দিয়েছে বিকেএমইএ। অবাক কাণ্ড! গার্মেন্ট মালিকদের সামর্থ্য মাত্র ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা!
বিদেশ থেকে আসা তহবিল এখনও আছে দুর্বল অবস্থায়। বিদেশি ফান্ডে গঠিত রানা প্লাজা ডোনারস ট্রাস্ট ফান্ডে এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশের গার্মেন্ট কেনে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই এক্ষেত্রে উদাসীন। তারা সাহায্য দিচ্ছেন না। এমনকি রানা প্লাজার গার্মেন্টগুলো থেকে পোশাক নিতো এমন ২৯ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠানই কোনো সাহায্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই হচ্ছে উন্নত বিশ্বের আধুনিক মালিকদের চরিত্র! একমাত্র আয়ারল্যান্ডভিত্তিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান প্রাইমার্ক ছাড়া রানা প্লাজার শ্রমিকদের প্রতি বাকি সবাই কম বেশি অবিচার করেছে।
এর বাইরে বিভিন্ন এনজিও প্রবাসীদের সাহায্য নিয়ে তহবিল গড়েছে। নানা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে শ্রমিকদের সাহায্যার্থে। এসব প্রকল্পের বেশকিছু অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে, প্রকল্প পরিচালনার জন্য যে কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের মোটা অঙ্কের বেতন দেয়া হচ্ছে এই তহবিলের টাকা থেকেই। অথচ জনগণ টাকা দিয়েছিল শ্রমিকদের সহযোগিতার জন্য। অনেক এনজিও তাদের তহবিল ধীরে ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছেন। এতে করে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তহবিলের টাকার ওপর মোটা অঙ্কের সুদ জমা হচ্ছে। অনেক এনজিওর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
মোট কথা, সরকার, বিজিএমইএ বা এনজিও- কেউই শ্রমিকদের জন্য যে টাকা তুলেছেন, তার পুরোটা ব্যয় করেননি। জনগণের দেয়া সহযোগিতা শ্রমিকদের হাতে তুলে দেয়াটাই ছিল তাদের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণেই রানা প্লাজা ধসের নয় মাসের দিন, অর্থাৎ ২৪ জানুয়ারি, সকালে একজন আহত শ্রমিক, সালমা আক্তার, শরীরের যন্ত্রণা ও ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। একে অপঘাতে মৃত্যু বলা হলেও এটা আসলে হত্যাকাণ্ড, এমন অভিযোগ অনেকেই তুলেছেন। দেখা যাচ্ছে, জনগণ শ্রমিকদের যে সহযোগিতা দিয়েছেন, তাই তারা বুঝে পাননি। আর তো মালিকদের দেয়া ক্ষতিপূরণ!
২.
ক্ষতিপূরণ নিয়ে আদালতে একটি মামলা আছে। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের স্বপ্রণোদিত রুলের প্রেক্ষিতে সুপারিশ করার জন্য কমিটি গঠিত হয়েছিল। কথা ছিল, আদালত ঠিক করে দিবে, কী হিসাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। কিন্তু এই মামলার তৎপরতা চলছে খুবই ধীরগতিতে। সুপারিশ কমিটি নিহত, নিখোঁজ ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুদের জন্য বাড়তি ১০ বছর কর্মক্ষমতা হিসাব করে ১৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা এবং আহতদের ক্ষতির ধরন অনুযায়ী দেড় লাখ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত লাখ টাকা দিতে সুপারিশ করেছে। বিজিএমইএর যে সদস্য ওই কমিটিতে ছিলেন, তিনি এর বিরোধিতা করেই স্বাক্ষর করেছেন। আদালত এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে আদালতের গঠিত সুপারিশ কমিটির বাইরে এ পর্যন্ত আরও দু’ ধরনের প্রস্তাবনা এসেছে। আহত শ্রমিকের ক্ষেত্রে তার চিকিৎসার ব্যয় এবং ক্ষতজনিত কারণে যতদিন কাজ করতে পারবেন না ততদিনের মজুরিসহ অন্যান্য ভাতাদি। নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের ক্ষেত্রে যতদিন তিনি কাজ করতে পারতেন ততদিনের বেতন ও অন্যান্য ভাতাদি। এই হিসাবে একজন আহত শ্রমিককে ৩০ লাখ টাকা এবং একজন নিহত, নিখোঁজ শ্রমিকের জন্য ৪৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবনা দেয় অনেক শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
গার্মেন্ট মালিকরা বরাবরের মতোই এই প্রস্তাব মেনে নিতে পারেননি। বিপরীতে মালিকপক্ষ বলছেন, ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ও বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী। বিদেশের হিসাব বাংলাদেশে করলে চলবে না। বিদেশিরা তাদের দেশের হিসাবে এখানে ক্ষতিপূরণ দিতে বললে হবে না। মালিকরা বলছেন, যে শ্রমিক ৩ হাজার টাকা বেতন পেতেন তাকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়াই যথেষ্ট। বেশি হলে তিন লাখ টাকা দেয়া যায়। এর বেশি দিতে গেলে তা হবে বাড়াবাড়ি।
মূলত মালিকরা যেটা ভয় পাচ্ছেন তা হলো, যদি একজন শ্রমিককে ৩০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, তবে এটাই নিয়ম হয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে এ ধরনের যে কোনো ঘটনা ঘটলে এই বিরাট অঙ্কের টাকা দিতে হবে। এটাই তখন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। মালিকরা সরকারকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। এ কারণেই সরকারপক্ষ সহযোগিতার পুরো টাকাটাও শ্রমিকদের হাতে পৌঁছানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও মালিকদের মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার সুযোগই বেশি।
শ্রমিকদের বিষয়ে মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই বন্ধুসুলভ তো নয়ই বরং তা শত্রুতাপূর্ণ। শ্রমিকের আত্মসম্মানবোধ বলে কিছু থাকতে পারে এটা মালিকরা ধর্তব্যেই নেন না। শুধু গার্মেন্ট মালিকরাই নন, এদেশের অধিকাংশ কারখানা, অফিস, প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঊর্ধ্বতনরা তাদের অধঃস্তনদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাই বলেন না।
সভ্যতা অনেক দূর এগুলেও বাড়ির কাজের লোককে মানুষ ভাবাটা এখনও অনেকে আয়ত্ত করতে পারেননি। কাজের লোকের আত্মসম্মান নিয়ে তারা চিন্তা করেন না। ফলে তাদের অভাব, অভিযোগ, চাহিদাকেও তারা বুঝতে সমর্থ হন না। কাজের লোকের আর চাহিদা কত? ও এত টাকা দিয়ে কী করবে? মালিকরা এমনটাই মনে করেন। শ্রমিকদের তারা কর্মকর্তা ভাবতে পারেন না, সহকর্মী ভাবতে পারেন না, তাই নিজেদের জন্য যেগুলোকে তারা মৌলিক অধিকার ভাবেন, শ্রমিকদের জন্য সেগুলোকে প্রয়োজনীয় মনে করেন না।
এ কারণেই মালিকরা জনগণের দেয়া সাহায্যও শ্রমিকদের দিতে বিরোধিতা করেন। অনেক মালিক মনে করেন, এভাবে বেশি বেশি টাকা দিলে শ্রমিকদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। ৩০ লাখ টাকা শ্রমিকের প্রাপ্য হতে পারে, এটা মানতেই পারছেন না মালিকরা। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের সময় যেমন তারা বলেছিলেন যে, ৮ হাজার টাকা শ্রমিকের বেতন হতে পারে না, এই টাকায় অফিসার পাওয়া যায়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি এখনও ক্রিয়াশীল।
৩.
ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটা আসে এজন্য নয় যে, এটা দিলেই ক্ষতিগ্রস্তদের সমস্যা মিটে যাবে। বরং ক্ষতিপূরণের মূল প্রশ্নটা হচ্ছে, যাদের কাঁধে দায়দায়িত্ব বর্তায়, তাদের সতর্ক করা। ক্ষতিপূরণ দেয়াটা আসলে তাদের জন্য একপ্রকার শাস্তিস্বরূপ। ক্ষতিপূরণকে এক্ষেত্রে এক কথায় জরিমানার সঙ্গে তুলনা করা যায়। রানা প্লাজার ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটি এত গুরুত্ব দেয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, এমন ঘটনা যেন আর কখনও না ঘটে। সব পক্ষ যেন সচেতন থাকে এরপর থেকে। রানা প্লাজার শ্রমিকরা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরও, শ্রমিকদের জোর করে কারখানায় ঢোকানো হয়। এটাকে তাই দুর্ঘটনার চেয়ে হত্যাকাণ্ডই বেশি বলা হয়েছে।
এমন ঘটনা যেন আর কেউ কখনও ঘটানোর সাহস না করে, সেজন্য দরকার ছিল দায়ীদের কঠিন শাস্তি দেয়া। বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকদের আধিপত্য এতই বেশি যে, আজ পর্যন্ত অসংখ্য গার্মেন্টে শ্রমিকরা লাশ হয়েছেন। তালাবদ্ধ করে শ্রমিককে পুড়িয়ে মারা হয়েছে চুরি ঠেকানোর নামে। কিন্তু কোনো গার্মেন্ট মালিকের বিচার এ যাবৎ হয়নি। রানা প্লাজার ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটা এখান থেকেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু মালিকরা ছাড় দিতে নারাজ। তাদের বাধ্য করবে যে সরকার, সেও এক্ষেত্রে নিশ্চুপ!
৪.
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে অনেক কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু শ্রমিকদের মুখে একটাই প্রশ্ন, আমরা কি কিছু পাব? এ প্রশ্নের উত্তর একটু পেছনে তাকালেই স্পষ্ট হবে বোধ করি। রানা প্লাজা ধসের পর বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে যে, আসলে সরকার কী চাচ্ছে!
প্রথমেই সরকারের একজন মন্ত্রী, মখা আলমগীর বললেন, নাড়াচাড়া দিয়ে ভবন ফেলে দেয়া হয়েছে। তার এই মশকরার বিরুদ্ধে সরকারকে কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি।
অনেকেই দাবি তুলেছিলেন যে, একটি লাশ রেখেও উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না। এই দাবির প্রতি সরকার কোনো শ্রদ্ধা দেখায়নি। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও কঙ্কাল, হাড়, খুলি মিলেছে। এগুলোকে গরুর হাড্ডি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন টিনের বেড়া দিয়ে এলাকাটা ঘিরে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ সেখানে গিয়ে কোনো হাড় বা খুলি না উদ্ধার করে। যার স্বজনের ডিএনএ মিলেছে সে যদি এখন ৩০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পায় আর যার স্বজনের লাশ চাপা পড়ে আছে সে যদি কবর বা ক্ষতিপূরণ কিছুই না পায়, এর দায়টা কি সরকারেরই না?
রানা প্লাজা ধসের পরই শ্রমআইন ২০০৬ সংশোধন করে প্রণয়ন করা হয়েছে শ্রম আইন ২০১৩। এই আইনে শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। শ্রমিকের শ্রমঘণ্টা নির্দিষ্ট করা হয়নি। উপরন্তু শ্রমিককে বিনা কারণে বহিষ্কার এবং সেক্ষেত্রে শ্রমিক কোনো সুযোগসুবিধা যাতে না পান, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে শৃঙ্খলার কোনো সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। কিন্তু বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে যে কোনো শ্রমিককে মালিক বহিষ্কার করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে বহিষ্কৃত শ্রমিক ভাতা বা প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।
শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির লড়াই করেছেন। তাদের দাবি ছিল ৮ হাজার টাকা মজুরি। ঢাকা শহরে কাজ করে, খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে হলে কোনো পরিবারের জন্য এটা ন্যূনতম প্রয়োজন। সরকার ৫ হাজার ৩০০ টাকায় দফা রফা করেছে। কিন্তু শ্রম আইনে বলা আছে, কোনো মালিক যদি চান, তাহলে তিনি স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে চুক্তিভিত্তিক ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিক মজুরি পাবেন। অর্থাৎ মজুরি কমিশনের নির্ধারিত স্কেলের বেতন বা সুযোগ-সুবিধা তাকে দিতে হবে না। মোট কথা, মজুরি বাড়ানো হলেও আইনের মাধ্যমেই আবার ওই মজুরি না দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
রানা প্লাজার ঘটনার সময় ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের মধ্যে তখন যারা আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন, মালিকরা তাদের তালিকা করে রেখেছিলেন। ছয় মাসের মাথায় অভিযোগ উঠেছে মালিকরা সেই তালিকা তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। গুণ্ডারা ওইসব শ্রমিকদের ধরে ধরে হাত পা ভেঙে, মারাত্মক জখম করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। ঘটনা এতই মারাত্মক আকার ধারণ করে যে, সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক লীগ এর প্রতিকার চেয়ে বিজিএমইএকে একটি চিঠি দেয়। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সেই চিঠির জবাবে বলা হয় যে, এটা শ্রমিকদের মধ্যকার অন্তর্কোন্দল। শ্রমিক লীগ এরপর নীরব হয়ে যায়। কিন্তু বেশকিছু গণমাধ্যম এরপর শ্রমিকদের নাম, ছবি, আহতের বিবৃতিসহ তথ্যপ্রমাণ পেশ করে সংবাদ প্রকাশ করে। সরকার এক্ষেত্রেও নিশ্চুপ ছিল, আছে!
সরকার ব্যাপক সক্রিয়তা দেখিয়েছে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের বিষয়ে। শ্রমিকের অধিকারের কথা বলে আমেরিকা জিএসপি সুবিধা বাতিল করেছে। মালিকরা বরাবরই ভয় পাচ্ছিলেন ইউরোপের বাজারে যদি আমেরিকার দেখাদেখি জিএসপি সুবিধা বাতিল হয়, তাহলে তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। কারণ গার্মেন্ট পণ্য আমেরিকায় জিএসপি সুবিধার বাইরে থাকলেও ইউরোপে এই খাতটি জিএসপি সুবিধা পায়। ফলে আমেরিকায় দ্রুত জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়াটা মালিকদের জন্য দরকার। সরকার সেক্ষেত্রে নানাভাবে তাদের সহযোগিতা করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করে জিএসপি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে অগ্রগতির খবর দিচ্ছেন।
রানা প্লাজা ধসের এক বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র এক দিন আগে সরকার গার্মেন্ট মালিকদের একটি পুরস্কার দিয়েছে। গার্মেন্ট মালিকদের উৎসে কর ০.৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৩ শতাংশ করা হয়েছে। রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, এতে করে আগামী এক অর্থবছরে অর্থাৎ জুলাই ২০১৪ থেকে জুন ২০১৫ পর্যন্ত সরকার দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। অর্থাৎ গার্মেন্ট মালিকদের বাড়তি লাভ হবে বছরে দুই হাজার কোটি টাকা।
কিছুদিন আগে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমেই বিজিএমইএ সভাপতির একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে। রানা প্লাজার আহত একজন শ্রমিক মেরুদণ্ডে ব্যথা পেয়ে গিয়েছিলেন বিজিএমইএ সভাপতির কাছে সাহায্য চাইতে। বিজিএমইএ সভাপতি তাকে বলেছেন হাত বা পা কিছু একটা কেটে নিয়ে আসতে। তা না হলে তো টাকা মিলবে না! সরকার এক্ষেত্রেও কোনো টুঁ শব্দ করেনি।
এসব ঘটনা একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়লে দেখা যাবে যে, সরকার আসলে গার্মেন্ট মালিকদের কথামতোই চলছে। নাগরিকের অধিকার ও ন্যায্য প্রাপ্য রক্ষার চেয়ে বড় ধনী মালিকের অধিকার তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারে থাকা লোকগুলোর অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে এই ব্যবসা থেকে সুবিধা পান বা নিজেরাই মালিক।
এখন পর্যন্ত রানা প্লাজা শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের জন্য অপেক্ষাটা পুরো মানবজাতির জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেছে বিশ্বের নামকরা গণমাধ্যমগুলো। সেই লজ্জা বয়ে আনছেন তাহলে কারা? এই দায় সরকার ও মালিকদের কাঁধে বর্তাবেই! মালিকরা চাইছেন ক্ষতিপূরণ না দিতে। জমা টাকা শ্রমিকদের দেয়ার ব্যাপারেও তাদের আপত্তি। সরকারের তৎপরতা শ্রমিকবিরোধী, মালিকের অনুকূলে। শ্রমিকদের তারা মানুষ ভাবতে রাজি নন। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে রানা প্লাজা থেকে সরকার বা মালিক, কোনো পক্ষই শিক্ষা নেয়নি। শ্রমিকরা শিক্ষা নিয়েছেন কিনা তা আমরা জানি না! যদি শ্রমিকরা শিক্ষা নিতে পারেন তার ফল সরকার ও মালিকদের জন্য যে ভয়াবহ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না!

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.