মুন্সিগঞ্জের মেঘনা নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যাওয়া তিন শতাধিক যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ থেকে এখন পর্যন্ত ২৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও দুই শতাধিক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের খোঁজে ভিড় করছেন স্বজনরা। লাশ দেখে ও খোঁজ না পেয়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পদ্মার পাড়।
অন্যদিকে শুক্রবার রাত নয়টা পর্যন্ত এমভি মিরাজ-৪ নামের ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে উদ্ধার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে উদ্ধারকারীরা। আইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার জানান, মেঘনার তলদেশে স্রোত, দমকা হাওয়া এবং দৃষ্টির কারণে উদ্ধার কাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ধার কাজ শেষ হতে মধ্যরাত পর্যন্ত লাগতে পারে।
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ লঞ্চটিকে টেনে মেঘনা তীরে কাছাকাছি নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার সদরঘাট থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া লতপুরে ঝড়ের কবলে পড়ে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে মেঘনা নদীতে ডুবে যায়। এ সময় কিছু যাত্রী সাঁতার কেটে পাড়ে উঠতে পারলেও নারী ও শিশুসহ বেশিরভাগ অনেক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে।
'লাশ চাই লাশ' বিক্ষোভে স্বজনরা
শুক্রবার সন্ধ্যা সোয় ৭টায় প্রচণ্ড ক্ষব্ধ হয়ে উঠে তারা। ‘লাশ চাই, লাশ চাই’ স্লোগান দিতে দিতে তারা ছুটে যায় উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তাঁবুর দিকে। তাদের দাবি প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্ধার কাজে ধীরগতি করছে। যাতে করে ডুবে যাওয়া লঞ্চে থাকা মৃত ব্যক্তিরা পানির নিচে তলিয়ে যায়। তাদের দাবি একটাই, জীবত নয়, মৃতই ফেরত চান পরিবারের প্রিয় মানুষটিকে।
উদ্ধারকাজ নিয়ে স্বজনদের প্রশ্ন
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, নবনির্মিত লঞ্চ উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ তৈরিতে জনগণের কী লাভ হয়েছে। শুরুতেই তাদের রশি ছিঁড়ে যাচ্ছে। এসব তৈরীতে বড় ধরনের দুর্নীতি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। এগুলো জনসাধারণের তেমন কাজে আসছে না। শুধু সরকারের অর্থ অপচয় হচ্ছে। জনগণের টাকা লুটপাট হচ্ছে। দিনভর নিখোঁজ যাত্রীদের আত্মীয় স্বজনরা নদী তীরে ভিড় করে আছেন। কেউ কেউ ট্রলার দিয়ে নদীতে লাশ খুঁজে ফিরছেন।
শুক্রবার সকালে ডুবন্ত লঞ্চের দুই মাথায় ক্রেনের সাহায্যে রশি বাধা হয়। পরে টেনে তোলার চেষ্টা করার একপর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একপাশের রশি ছিড়ে লঞ্চটি আবার সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। এর ফলে লঞ্চ উদ্ধার চেষ্টা বন্ধ রয়েছে। পুনরায় লঞ্চের গায়ে ক্রেনের সাহায্যে রশি বাঁধতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা।
তবে একাধিক উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা জানান, ডুবন্ত লঞ্চে আটকা পড়া লাশ ও মালামালের কারণে লঞ্চের জানালা-দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই টেনে তুলতে সমস্যা হচ্ছে। এ লঞ্চটি এর আগেও দুইবার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল বলে জানা গেছে।
যাদের পরিচয় মিলেছে
মেঘনার বুকে ডুবে যাওয়া এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চটিতে নিহত ২৯ জনের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম থেকে এখন পর্যন্ত যে লাশ গুলোর পরিচয় মিলেছে তা হলো , শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর গ্রামের সর্দার বাড়ির এলাহী বক্সের ছেলে জামাল সিকদার (৫০), নড়িয়ার রাহাপাড়ার স্বামী ফজলুল হক আকন্দের স্ত্রী সেতারা বেগম (৫৫), পাঁচগাও গ্রামের কাজী লিটনের স্ত্রী টুম্পা (২৬), মিজানুর রহমানের সন্তান মাহি (৪), সুরেশ্বর দরবার শরীফ এলাকার জালাল সিকদারের ছেলে আরিফ (দেড় বছর)। পাঁচগাও এলাকার লিটন কাজীর মেয়ে সুমনা (৮), সুরেশ্বর এলাকার আরব আলীর ছেলে জলিল মালত (৫০), নড়িয়া এলাকার আকাশ পন্ডিতের ছেলে মানিক (১৪), একই এলাকার মাসুমের ছেলে আব্দুল্লাহ আল রেদোয়ান (৪০), ইদ্রিস শেখের স্ত্রী রাশিদা বেগম (৬০), নন্দপাড় এলাকার মৃত হোসেন আলীর ছেলে খোরশেদ আলী খন্দকার (৪৫), মৃত জালাল আহমেদ মোল্লার ছেলে ওসমান গণি মোল্লা (৪০), ডুলকাঠি এলাকার রহিম ফকিরের ছেলে ইসমাইল ফকির (৬৫), কার্তিকপুর ভেদরগঞ্জ এলাকার মৃত শ্রীনাথ দাসের ছেলে কৃষ্ণ মন্ডল কৃষ্ণ (৫০), পাঁচগাও এলাকার মৃত নুরুল ইসলাম খানের ছেলে আব্দুল জলিল (৫৫)। সাহিনুরের স্ত্রী আকলিমা আক্তার রিয়া (৩৫), আইকপাড়া এলাকার দুলাল বেপারীর স্ত্রী রহিমা বেগম (৫৫), শরিয়তপুরের কালু দেওয়ানের স্ত্রী লাইলী বেগম (৫০), রিপন মৃধার মেয়ে রিতু আক্তার (১২), কলকাঠি এলাকার মান্নান দেওয়ান (৫০), কার্তিকপুর গ্রামের মৃত শ্রীদাম চন্দ্র দাসের স্ত্রী পূর্ণ লক্ষী দাস (৮৫), ভেদরগঞ্জ এলাকার খলিলুর রহমার সৈয়ালের বাবা রহিমা (৩২), মাসুমের মেয়ে রোমান (৫), পটিয়া ভেদরগঞ্জের মৃত আরব আলী খায়েঁর ছেলে জালাল খাঁ (৭০), ইউনুস মোল্লার ছেলে মিন্টু মোল্লা (৪০), চাঁদপুরের তমিজউদ্দিন (৫০), আব্দুল খালেকের ছেলে মাসুম (৪০), পূর্ব নড়িয়া এলাকার হাফিজ ব্যাপারির স্ত্রী ডরমা আক্তার (৩২), পূর্ব চরকৃষ্ণ গ্রামের মৃত আব্দুল লতিফ শিকদারের ছেলে আব্দুল কাদের শিকদার (৫০)।

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.