(সাপ্তাহিক ‘সাপ্তাহিক’) - লিখেছেন- অঘোর মণ্ডল
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : সাইনবোর্ড লাগিয়ে কোনো কিছু দখল বেআইনি।
একটা নয়, হঠাৎ করে একাধিক সাইনবোর্ড ধানমন্ডি মাঠের চারপাশে! যেখানে খুব বড় করে লেখা- ‘ধানমন্ডি খেলার মাঠ। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।’ এই সাইনবোর্ডটা লাগানোর পরই পাল্টে গেল ধানমন্ডি মাঠের চেহারা। সেখানে নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। এলাকার শ’খানেক বালক-কিশোর-তরুণ নেমে পড়লেন ফুটবল, ক্রিকেট বল-ব্যাট নিয়ে। প্রায় বছর তিনেক পর ধানমন্ডি মাঠে সাধারণ মানুষের পা পড়ল। এলাকার বালক-কিশোর-তরুণদের মাঠে নামার অপেক্ষার অবসান হলো। একটা সাইনবোর্ড। কী অসামান্য ক্ষমতা তার!
আবার এই সাইনবোর্ড প্রমাণ করল ক্ষমতার দাপটে কীভাবে এলাকার মানুষকে খেলাধুলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়; ক্ষমতা দেখিয়ে কীভাবে গৃহপূর্ত বিভাগের একটা মাঠ, যার দেখভালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের, সেটাকে দখল করে রাখা হয়েছিল! হ্যাঁ, দখল যদি না করা হবে তাহলে সিটি করপোরেশনকে সাইনবোর্ড লাগিয়ে কেন বলতে হচ্ছে- ধানমন্ডি খেলার মাঠ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত! কেন এই মাঠ উন্মুক্ত করতে ডিএসসিসি’র দুই দু’জন ম্যাজিস্ট্রেটকে আসতে হলো মাঠ উদ্ধার অভিযানে! কেন তাদের মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হলো, ‘আদালতের পূর্বের আদেশে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশে ধানমন্ডি মাঠ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।’
উন্মুক্ত করে দেয়ার অর্থ মাঠটা আগে অবরুদ্ধ ছিল । কিংবা কেউ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল। যাদের কাছ থেকে মুচলেকা নেয়া হয়েছে- মাঠটা তারাই দখল করে রেখেছিলেন। সিটি করপোরেশন সেটা জানতো। আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে এই মাঠ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলো, এরকম একটা বার্তা দিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্তারা। সঙ্গে আরও একটা তথ্য আছে- উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশে মাঠটা সবার জন্য উন্মুক্ত করলেন তারা!
তাহলে মানুষের মনে পাল্টা একটা প্রশ্ন কি জাগে না; আদালতের রায়ের চেয়ে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশন আসলে আদালতের নির্দেশ আগেই পেয়েছিল। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছাড়া তারা এই মাঠ উন্মুক্ত করতে চায়নি! যে কারণে এই মাঠ উন্মুক্ত করতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এলাকার মানুষ, পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন। সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। অথচ ধানমন্ডি এলাকার গোড়াপত্তনের সময় এই মাঠ এলাকার মানুষের খেলার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। এই মাঠে শুধু ধানমন্ডি এলাকার মানুষ নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ছেলেরা খেলাধুলা করতেন। এই মাঠে খেলে উঠে এসেছেন জাতীয় দলের অনেক ফুটবলার-ক্রিকেটার। কিন্তু সেই মাঠে খেলার অধিকার হরণ করা হলো সাধারণ মানুষের। এবং যারা মাঠ দখল করে রাখলেন, তারা সাধারণ মানুষকে উপহাস করার ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বললেন; ‘মাঠ খুলে দেয়া হবে এলিটদের জন্য। টোকাইদের জন্য নয়!’ এখন তাহলে কি বাংলাদেশে এলিটতন্ত্র চলছে? এলিট কারা? আর সেই এলিটতন্ত্রটা কী? এই প্রশ্নগুলো মানুষের মনে। উত্তর কে দেবেন জানি না।
বর্তমান সরকার নিজেদের গণতান্ত্রিক হিসেবে দাবি করতে কখনো কার্পণ্য করেনি। তর্কযোগ্যভাবে হলেও ধরে নিতে হবে বর্তমানে দেশে একটা গণতান্ত্রিক সরকার আছে। সেই সরকার এলিটতন্ত্রের প্রবর্তক কি না, উত্তরটা তারা দিলেই ভালো। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান না পড়লেও একটা কথা সবাই জানেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এলিট বলে কোনো শ্রেণী নেই। এখানে একজন টোকাইয়েরও এক ভোট আর হঠাৎ গজিয়ে ওটা একটা শ্রেণী যারা নিজেদের এলিট বলে প্রচার করে বেড়ান, তাদেরও এক ভোট। তারপরও মানতে হবে, আমাদের এই সমাজ আর শাসনব্যবস্থায় ‘টোকাই’ নামে একটা শ্রেণীর জন্ম হয়েছে। কিন্তু ওরা কেন টোকাই? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের লেখা একটা বইয়ের নামকরণ ‘ওরা কেন টোকাই’। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, একটা ক্লাবের নামের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভাইয়ের নাম জুড়ে দিয়ে ধানমন্ডি মাঠকে যারা দখল করে রাখলেন; তারা শিষ্টাচার ভুলে সাধারণ মানুষকে ‘টোকাই’ বলে উপহাস করার ঔদ্ধত্য দেখালেন! যা বঙ্গবন্ধু পরিবারের নীতি-আদর্শ, জীবনযাত্রা-পারিবারিক মূল্যবোধ সবকিছুর সঙ্গে বেমানান। অথচ সেই পরিবারের একজন শহীদের নাম ব্যবহার করে দখল করে রাখা হয়েছিল ধানমন্ডি মাঠটি! বঙ্গবন্ধু পরিবার যেখানে ধানমন্ডিতে নিজেদের বাড়িটাকেই জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, সেখানে সেই পরিবারের সদস্যের নাম ভাঙিয়ে একটা মাঠ দখল করে রাখা, বঙ্গবন্ধু পরিবারের ইমেজকে জনমানসে হেয় করা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। শহীদ শেখ জামাল বঙ্গবন্ধুর ছেলে, একজন ফুটবলার, একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন সেনাকর্মকর্তা। ধানমন্ডি মাঠ দখল করে একটা লিমিটেড ক্লাব বানাতে গিয়ে যারা শেখ জামালের নাম ব্যবহার করেছেন, তারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের ইমেজকে কিছু লিমিটেড মানুষের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতে চান, যা ক্রীড়াপ্রেমী বঙ্গবন্ধু পরিবারের জন্য মর্যাদাকর কিছু নয়।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী যতটা সাধারণ ভাষায় লেখা, সেখানে ততটা অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে তিনি সাধারণ মানুষের মাঝ থেকে উঠে এসে কীভাবে জনগণের নেতা হয়ে গেলেন। সেই বঙ্গবন্ধুর ছেলের নামে একটা লিমিটেড ক্লাব হবে, সেই ক্লাবের নামে একটা মাঠ দখল করা হবে, আবার সেটা ‘এলিট’দের জন্য খুলে দেয়ার ঘোষণা- এর সবকিছু বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের নীতি-আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটরা এসে ধানমন্ডি মাঠ উন্মুক্ত করে দেয়ার সময় মারফত আলী নামে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের এক নিরাপত্তাকর্মীর কাছ থেকে একটা মুচলেকা নিয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পূর্বানুমোদন ছাড়া এ মাঠ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে কোনো বাধা দেয়া হবে না।’ এই মুচলেকায় পরিষ্কার হয়ে গেল, সর্বসাধারণকে মাঠ ব্যবহারে বাধা দিয়েছে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব লিমিটেড! এরকম একটা কাজে জড়িয়ে গেল বঙ্গবন্ধু পরিবারের নামটা!
তবে মাঠের পাশের সাইনবোর্ডগুলো আপাতত একটা উপকার-ই করলো। ধানমন্ডি এবং তার আশপাশের মানুষের মাঝে ‘এলিট’ আর ‘টোকাই’এর বিভাজনটা মুছে দিল ‘সর্বসাধারণ’ শব্দটা বুকে নিয়ে। কিন্তু তারপরও একটা আশঙ্কা থাকছে। এই সাইনবোর্ড কতদিন থাকবে? সাইনবোর্ডটাকে সরিয়ে ফেলার নতুন কোনো ফন্দিফিকির চলছে নাতো! সঙ্গে আরও একটা প্রশ্ন- এই মাঠ যদি সর্বসাধারণের হয়, তাহলে সেই মাঠে ঢোকা কীভাবে অনধিকার চর্চা হলো! যারা ঢুকেছিলেন তাদের বিরুদ্ধেই বা কীভাবে মামলা হলো! তবে এই সব প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন শহীদের নামকে এই ২০১৪-তে এসেও টেনে নিয়ে যাওয়া হলো ধানমন্ডি থানায়! ধানমন্ডি মাঠে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে যে ভদ্রলোক মামলা করেছেন, সেই আরিফুর রহমান ধানমন্ডি শেখ জামাল ক্লাব লিমিটেডের সেক্রেটারি। আরিফ সাহেবের নামের সঙ্গে শহীদ শেখ জামালের নামটাও ওঠে পড়লো ধানমন্ডি থানার কাগজপত্রে! হয়তো নামটাকে টেনে নেয়া হবে আদালত পর্যন্ত! যা ওই নামটার সম্মান আর মর্যাদাকেই ছোট করবে।

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.