রাজধানীতে ওভারব্রিজ থাকলেও এবং দিনদিন এর সংখ্যা বাড়ানো হলেও রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে তা ব্যবহারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ কেউই। আইন থাকলেও প্রয়োগে তদারকি নেই সরকারি কোনো সংস্থারই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ‘ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট স্টাডি ইন ঢাকা সিটি’ বিষয়ে এক গবেষণা উপস্থাপন করে দৈনিক নয়াদিগন্ত জানিয়েছে, ঢাকার ৩০টি সড়ক অধিক দুর্ঘটনাপ্রবণ। এর প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে ফুট ওভারব্রিজ এবং ব্রিজ ও ক্রসিং এলাকাগুলোতে দুর্ঘটনার হার সর্বাধিক।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, ঢাকা শহরে প্রতি বছর ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করায় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অন্তত ৫৯৭ জন। এর মধ্যে গত বছর দুর্ঘটনায় হতাহত ছাত্রছাত্রী ছিল ৩৬ জন।

ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দণি দুই অঞ্চলে ফুট ওভারব্রিজের সংখ্যা ৫৪। এর মধ্যে যথাযথ ব্যবহৃত ব্রিজ মাত্র সাতটি। অন্যগুলো ব্যবহারের হার মাত্র ৮ থেকে ১৫ শতাংশ। ফুট ওভারব্রিজের মধ্যে ঢাকা উত্তরের জোন-১-এ (উত্তরা) চারটি, জোন-২-এ (মিরপুর-পল্লবী) চারটি, জোন-৩-এ (গুলশান) ১২টি এবং জোন-৪ (মিরপুর-কাজীপাড়া-গাবতলী) এলাকায় পাঁচটি রয়েছে। এ ছাড়া জোন-৪ (গাবতলী), জোন-৫ (কাওরান বাজার) ও গুলিস্তানে তিনটি আন্ডারপাস রয়েছে। বাকি ২৯টি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে। স্টিল ফুট ওভারব্রিজের মধ্যে ১১টি সিটি করপোরেশনের নির্মিত। আরো ছয়টি নির্মাণাধীন। তাদের অধীনে গার্ডার ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে ১১টি এবং আরসিসি ফুট ওভারব্রিজ রয়েছে ৯টি। ১২টি স্টিল ব্রিজ নির্মিত হয়েছে ডিইউটিপির অধীনে এবং তিনটি আরসিসি ব্রিজ নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট উপলক্ষে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায় বনানী ১১ নম্বর রোডের সামনে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি এসকেলেটরসমৃদ্ধ ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করে। চলতি বছরই আরো চারটি পয়েন্টে নতুন ব্রিজের প্রকল্প নেয়া হচ্ছে বলে সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে।

সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সরকার নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করে আসছে। স্টিল, আরসিসি বা গার্ডার স্ট্রাকচারের মাধ্যমে এসব ব্রিজ নির্মাণে প্রতিটিতে ৩৫ লাখ থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর নতুন নতুন ব্রিজ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে টাকা ছাড় করানোর দিকে ঝোঁক থাকলেও এগুলো কতটুকু ব্যবহার হচ্ছে সে দিকে নজর নেই। এ প্রসঙ্গে উভয় সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা জানান, মেইনটেন্যান্সের জন্য তাদের যথেষ্ট লোকবল ও ফান্ড নেই। কাজেই তাদের দায়িত্ব ব্রিজ নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

রাজধানীর ফুট ওভারব্রিজের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে পথচারী পারাপারে। বাকিগুলো পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। ব্রিজ ব্যবহার না হওয়ার বেশ কিছু কারণও ওই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করে দৈনিক নয়া দিগন্ত। যেমন-

১. অনীহা ও সময় বাঁচানোর মানসিকতা

২. রক্ষণাবেক্ষণের অভাব

৩. আইন প্রয়োগে শিথিলতা

এদিকে ফুট ওভারব্রিজ যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ায় দিনদিন বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। বুয়েটের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৯৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে ৩০টি সড়কে। তন্মধ্যে ৫৪ শতাংশ ঘটছে দিনের আলোয় এবং ৭৩ শতাংশ হচ্ছে ট্রাফিক আইন অমান্য করায়। ঢাকায় গণপরিবহনের চালকদের ৬০ ভাগেরই যান চালানোর যথেষ্ট দক্ষতা নেই। একই সাথে প্রাইভেট কার চালকদেরও একটি বড় অংশেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স ভুয়া। ফলে তারা নির্দিষ্ট গতি ও স্থানভেদে দক্ষতার সাথে যানবাহন চালাতে পারছেন না। আর তাদের প্রধান শিকার হচ্ছেন পথচারীরা। গত ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে তিন হাজার ৬২৮টি। প্রসঙ্গত সরকারিভাবে আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে আরো ফুট ওভারব্রিজ ও রোড ডিভাইডার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত

Author Name

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.