সাদিয়া আফরিন 
বাসি পোলাও যে কতটা অমৃত সেটা অনিলের খাওয়ার ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায় । তার সাথে টমেটোর সালাদ আর গোশতের ঝোল হলে তো কথাই নেই ।খেতে বসে অনিল ভালো করে দেখল লীলা আজ খুব ছিমছাম ভাবে এসেছে । নীল শাড়ী আর সব নীল সরঞ্জাম টিপ , চুড়ি , কানের দুল । মেয়েদের লাল রঙের শাড়ীতে বউ বউ লাগে কিন্তু লীলাকে নীল পড়লে অপূর্ব সুন্দরি লাগে । একদম পুরদস্তুর গৃহবধূ লাগে । প্রায় দুপুরেই ক্যান্টিনের কোণার টেবিলে গরে ওঠে তাদের এই ক্ষণিকের সংসার। লীলার অনিলের দিকে ভ্রুক্ষেপ ও নেই সে অনিলকে বাসি পোলাও বেড়ে দেয়ায় ব্যস্ত তবে অন্যমনস্ক ভাবে । কারণ অনিল খেয়াল করল ওর প্লেট খালি হতে না হতেই লীলা আরও ঢেলে দিচ্ছে । কিছু জিজ্ঞেস করলেই অপ্রাসঙ্গিক ভুমিকা টানবে লীলা । অনিল ভাবল খেতে খেতে ওইগুলাও হজম করতে হবে যদি এক্ষুনি ও প্রশ্ন করে, “কি হয়েছে?” তবুও নীল আকাশে আজ আর কালো মেঘ জমতে দিল না অনিল জিজ্ঞেস করেই বসল
“তুমি কি খুব চিন্তিত?”
লীলা প্রশ্ন শুনে এমন জোরে শ্বাস ফেলল যেন বহুদিন পর কোন পানির নল কে আটকে রাখার পর সেটার মুখ খুলে দেয়া হয়েছে ।
“জানো , ছোটবেলায় আমি সবচেয়ে বেশি কার জন্য অপেক্ষা করতাম?”
“না এটা তো আমার জানার কথা না ।”
“শোন আমি ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষা করতাম ।”
খাবার প্রায় গলায় আটকে যাবার মত হল অনিলের
“কেন?”
“আব্বু , চাচ্চুদের চিঠি আসবে আর আমি খাম থেকে স্ট্যাম্প গুলো ছিঁড়ে নিয়ে অন্য খাতায় জমিয়ে রাখব আর নিচে দেশের নাম লিখে রাখতাম ।”
“তো ছোটবেলার ডাকপিয়ন কে নিয়ে চিন্তিত তুমি?”
“নাহ ভাবছি এমন আরেকটা খাতা করব কিন্তু ওটা তে ছবি থাকবে । কার ছবি জানো?”
“নাহ আমি এটাও জানি না।”
অভিমানের সুরে লীলা বলে উঠল, “তোমার জানার ইচ্ছাই নেই থাকলে বুঝেই যেতে।”
অনিলের খাওয়ার মনোযোগে ভারি ছেদ পড়ল । সে প্লেট থেকে বলতে গেলে এক প্রকার হাত উঠিয়ে নিলো বলল ,
“খুব বেশি ইচ্ছে নেই । কিন্তু না শুনলে তুমি আমাকে খাবার হজম করতে দিবে না ।“
এই বলে অনিল হো!হো!! হো!!! করে হেসে উঠল ।
“আমি পাত্রপক্ষের পাত্রদের ছবিগুলো জমিয়ে ঐরকম একটা খাতা বানাব নিচে তাদের নাম আর তার বয়স লেখা থাকবে।“
কথাগুলো ঝড়ের বেগে লীলা যেমন বলল অনিলের কানে ঠিক সেভাবেই প্রবেশ করল । তার মনোযোগের খাওয়া আর হাসির ব্যারোমিটার টা আস্তে আস্তে নামতে লাগলো । এতটাই আস্তে যে লীলা খেয়াল করলেই গুনতে পারত কয়টা পোলাওয়ের দানা অনিলের গলা বেয়ে পেটের দিকে যাচ্ছে ।
“কেন আবার কেউ এসেছে? তোমাকে না বলেছি কোন চিন্তা করতে না । কিছুদিনের মধ্যেই একটা হিল্লে হয়ে যাবে ।”
“কিন্তু কবে সেটা??????”
“তো কি বলে না করলে?”
“বলেছি দেখতে পছন্দ হয়নি ।“
“কেন পাত্র দেখতে কেমন?”
“ মোটা , এত্ত বড় ভুঁড়ি , যেন শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যায় , চুল নেই , কথা বলতে আমতা আমতা করে , তোতলায় ।“
ভাগ্যিস প্লেটের খাওয়াটা শেষ হতে হতে অনিল এটা জিজ্ঞেস করেছিল । না হলে খাওয়ার শেষ অংশের মজাটাও নিতে পারত না । কিন্তু পানিটা মনে হয় আর গলা দিয়ে নামবে না । কারণ ...।
“আচ্ছা তুমি কি কাণ্ডজ্ঞানহীন ?”
“ও আমি কাণ্ডজ্ঞানহীন ঠিকই বলেছ । কাণ্ডজ্ঞানহীন না হলে হলে কি তোমার জন্য অপেক্ষা করি?”
“আরে তুমি এমন কিছু কারণ দেখালে ছেলেটার বিরুদ্ধে যেগুলো আমার মধ্যেও আছে আমিও বিশাল ভুঁড়িওয়ালা , আমার ও মাথায় চুল নেই যাও আছে পেকে যাচ্ছে আমি কথা বলতে গেলে তোতলাই ।“
“অনিল! খবরদার কারও সাথে তোমার তুলনা করবে না।তুমি আর ওই লোকটা কি এক?”
“এক না কিন্তু কিছুদিন পর যখন ...।“
“থাক আর বলবে না তুমি । কিন্তু পরবর্তীতে এই তুলনা জীবনেও করবে না । “
“করলে কি করবে?” ।
“তোমার মগজ চচ্চড়ি করে ক্যান্টিনে রেখে যাব।”
“রেগে গেলে মানুষ এত হাসির কথা বলতে পারে সেটা তোমাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না । আচ্ছা তুমি কি জানো কেন তুমি আমার এই দোষগুলো কখনই দেখনি কেন?”
রাগে হাত কচলাতে কচলাতে দাঁতে দাঁত চিবিয়ে লীলা বলল , “না ।“
“কারণটা আর কিছুই না । আমাদের মধ্যবিত্ত ভালবাসা ।”
“হয়েছে আর নতুন শদ বলে আমার মন ঘোরাতে হবে না।“
“আমি ঘুরাব না তোমার মন এমনিতেই ঘুরে যাবে আমাদের মধ্যবিত্ত ভালোবাসা কে চিনলে । “
“চিনে কি হবে ।“
“চিনলে তোমার আমার মধ্যবিত্ত মন বেঁচে থাকবে আমাদের জন্য আজীবন ।এই দেখ মধ্যবিত্ত শব্দটার মধ্যে একটা লুকায়িত ভাব থাকে জানত? আমাদের মধ্যবিত্ত মা বাবারা কখনই তাদের মধ্যবিত্ত কষ্ট টের পেতে না আমাদের । ঠিক আমাদের মধ্যবিত্ত মন কখনই কাউকে জানতে দেয় না আমরা একে অপরের কতটা কাছে নিঃশ্বাসের মত পাশাপাশি । আমাদের মাঝে কোন দিনভেবে কাজ করা হয়না । কোন দিন ভেবে একে অপরকে কিছু দেয়াও হয়নি । হুট করে কোন লুকায়িত কারণ ছাড়াই একে অপরের উপহার নিয়ে আসি । হুট করে কোন কারণ ছাড়াই তুমি আমার কঠিন কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শোন আর আমি শুনি তোমার অপ্রাসঙ্গিক ভুমিকা গুলো । আমরা নিজেরদের মাঝে নিজেদের খুব খুজে পাই তবুও দিন ক্ষণ ঠিক করে বন্ধু লোক ডেকে বলিনি তোমাকে পেয়ে আমি আকাশচুম্বী সুখী । ধর যদি না পাই আমাদের কে আমরা তবুও খুজে পাব এই মধ্যবিত্ত সুখে । আমার তোতলামিতে তুমি ভালোবাসা খুজে পাও তোমার বোকামিতে আমি আমাকে ফিরে পাই । জগত জুড়ে লোকে কি তা বুঝবে । ঠিক তাও না তুমি আমি হা হয়ে যাব ওদের বোঝাতে গেলে নোটিশ বোর্ড দিয়েও পারব না............ ।“
লীলা গলা ভারি করে বলল,
“ওহ তোমার কথায় আমি নিজেই হা হয়ে যাচ্ছি অনিল । এখানেই ক্ষান্ত দাও।”
অনিল লীলার হাত ধরে বলল,
“নাহ মধ্যবিত্ত মনের কোন শেষ নেই , কোন নির্দিষ্ট কিছুই নেই । আছে শুধু নিঃশ্বাসের মত অনুভব । যে অনুভবে আমি এখন বুঝতে পারছি নীল আকাশে বৃষ্টি নামবে এখন ...।।
লীলা খুব আস্তে করে অনিলের কানের সামনে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“এই মধ্যবিত্ত ভালাবাসায় তোমাকে ছাড়া আর কাউকেই চাই না আমি । আর কঠিন করো না তো !!!!!!!!।”
“মধ্যবিত্ত ভালাবাসা” 
This is the most recent post.
পুরাতন পোস্ট

Author Name

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.